গুমবিরোধী অধ্যাদেশ বাতিল, কোন গন্তব্যে বাংলাদেশ?

দেশগুমবিরোধী অধ্যাদেশ বাতিল, কোন গন্তব্যে বাংলাদেশ?

গুমবিরোধী অধ্যাদেশকে আইনে রূপ না দিয়ে সরাসরি বাতিলের সিদ্ধান্ত—এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং ইউনুস থেকে তারেকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের এক অবধারিত, পূর্বনির্ধারিত পরিণতি। আজ যারা ‘শকড’ হওয়ার অভিনয় করছেন, তাদের দেখে করুণা করবো, নাকি আমিও ভান করে বিস্মিত হবো—সেটা বুঝে উঠা কঠিন। বাস্তবতা হচ্ছে, এটি কেবল শুরু; সামনে আরও কী কী ঘটতে যাচ্ছে তার একটি স্পষ্ট আগাম বার্তা এই সিদ্ধান্ত বহন করছে। যারা ঘটনাপ্রবাহের গভীরে তাকাতে অস্বীকার করেছেন, তারাই আজ নাটকীয়ভাবে বিস্ময়ের অভিনয় করছেন।

প্রশ্নটা সোজা—গুমের সঙ্গে জড়িত সেনা কর্মকর্তাদের ক্যান্টনমেন্টের তথাকথিত সাব-জেলে আটকে রাখার প্রহসন কি ইউনুস সরকার থামাতে পেরেছিলো? পারেনি। বরং রাষ্ট্র ও জনগণের প্রত্যাশাকে প্রকাশ্যেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওয়াকার এন্ড গং অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের সাধারণ কারাগারে স্থানান্তর না করে, একপ্রকার বিলাসবহুল বন্দিত্বের ব্যবস্থা করে দেয়। কাউকে কিছু না জানিয়ে তড়িঘড়ি করে ক্যান্টনমেন্টের অভিজাত ভবনকে ‘সাব-জেল’ ঘোষণা করা হয়—যেখানে ইন্টারনেট, টেলিফোন, উন্নতমানের খাবার, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকার সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়েছিলো। এটাকে যদি জেল বলা হয়, তাহলে পৃথিবীর অন্য কোথাও এর চেয়ে বেশি ‘মানবিক’ জেলের উদাহরণ আদৌ আছে কিনা তা খুঁজে দেখা দরকার।

এতেই শেষ নয়। জাতির সঙ্গে উপহাস করার জন্য বিলাসবহুল এয়ারকন্ডিশন্ড বাসে করে এই অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়া করা হয়েছে। সবুজ রঙের সেই বহুল আলোচিত ‘প্রিজন বাস’ নিশ্চয়ই এখনো মানুষের স্মৃতিতে টাটকা আছে। প্রশ্ন হলো—এই সবকিছু কীভাবে সম্ভব হলো? কোন অদৃশ্য সমঝোতা, কোন নীরব চুক্তির ভিত্তিতে এই প্রহসনের মঞ্চায়ন করা হয়েছিলো? যারা তখন এই প্রশ্নগুলো করেননি, তারাই আজ গুমবিরোধী অধ্যাদেশ বাতিলে বিস্মিত হওয়ার অভিনয় করছেন।

জুলাই বিপ্লবের পরও কেন ওয়াকার ও চুপ্পুকে সরানো হয়নি—এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত সরল: বিএনপি তা চায়নি। এটি কোনো অনুমান নয়, কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়—এটি নির্মম বাস্তবতা, যা আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। ‘বুকে পাথর চাপা দিয়ে’ ড. ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নেওয়া ওয়াকার কি কখনো তার প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে? রাওয়া ক্লাবে প্রকাশ্যে নাম ধরে সম্বোধন করার যে ঔদ্ধত্য, তা কি কেবল ব্যক্তিগত অসম্মান ছিলো, নাকি গোটা জাতির প্রতি অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ? রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী হয়ে কোনো দায়িত্বশীল পদাধিকারীকে পদবী ছাড়া নাম ধরে সম্বোধন করা যে চরম ধৃষ্টতা—এই মৌলিক শালীনতাটুকুও কি আমরা ভুলে গেছি?

এর চেয়েও গুরুতর বিষয়—দেশের এক স্পর্শকাতর সময়ে প্রধান উপদেষ্টার অনুমতি ছাড়াই বৈরী রাষ্ট্র ভারতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে ওয়াকারের একান্ত বৈঠক। সরকারকে পাশ কাটিয়ে সেনাপ্রধান কী ক্ষমতায় এই ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠক’ করেছেন? রাষ্ট্রের কোন আইনি কাঠামো তাকে এই ক্ষমতা দেয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অমীমাংসিত।

ড. ইউনুস নিজেই স্বীকার করেছেন—শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া আমলাতন্ত্র, সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই, তার নির্দেশ মানছিল না। এই সেই আমলারা, যাদের ‘টিকি’ দিল্লিতে বাঁধা। তারাই দিল্লির মধ্যস্থতায় তারেক রহমানকে ক্ষমতায় বসিয়েছে—তাদের ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’ নিয়েই তিনি লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন। খালেদা জিয়া জীবিত থাকা কালে সেই ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’এর অভাবে দেশে ফিরতে পারেননি তারেক—এই বাস্তবতা কি আমাদের কিছু বলে না?

এই সমগ্র প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো এক সালাউদ্দিন—যার প্রভাব ও দাপটে বিএনপির ত্যাগী নেতারাও কোণঠাসা। এমনকি সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে বসিয়ে রেখে তার সামনেই তার হয়ে বক্তব্য দেওয়া—এ এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক অবক্ষয়। খালেদা জিয়া তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কখনো নিজের সম্মান এতটা বিসর্জন দেননি। প্রশ্ন জাগে—তারেক রহমানের সমস্যা কি কেবল অযোগ্যতা, নাকি আত্মসম্মানবোধের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি? নাকি তিনি নিজেই এক পুতুলে পরিণত হয়েছেন, যার কাজ কেবল ক্ষমতার চেয়ারে বসে থাকা?

এই আত্মসম্মানহীনতা এখন আর ব্যক্তিগত সীমায় আবদ্ধ নেই—এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে কবর দিতে যা যা প্রয়োজন, তার বিনিময়েই এই ক্ষমতার বন্দোবস্ত করা হয়েছে—এটা এখন আর অনুমান নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা।

আসিফ নজরুল, সালাউদ্দিন ও ওয়াকার—এই ত্রিভুজের ভেতরে বন্দি করে তারেককে সামনে রেখে ভারত তার খেলা চালিয়ে ছিলো। আগে তারা আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে খেলেছে, এখন নতুন বাহন পেয়েছে। রাষ্ট্রের ভেতরে গেঁড়ে বসা সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র—যাকে অনেকে ‘ডিপ স্টেট’ বলে—তাদের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে কার্যত একটি বাফার স্টেটে পরিণত করা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—এই অবস্থার জন্ম দেয় কারা? সেই দলদাস, আত্মসম্মানহীন ও অযোগ্য মানুষগুলো, যারা ব্যক্তি বা যোগ্যতা নয়, কেবল ‘মার্কা’ দেখে। যাদের কাছে রাজনীতি মানে চর দখলের আদিম লড়াই; যারা বিজয়ীদের সঙ্গে ভিড়ে গিয়ে একধরনের বর্বর তৃপ্তি পায়। কেউ ভোট বিক্রি করে, কেউ বুদ্ধি বিক্রি করে, কেউ বিবেক বিক্রি করে—এবং এই বিক্রির বাজারেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়।

এই শ্রেণীর মানুষের কাছে দেশপ্রেম কোনো মূল্য নয়; সামান্য স্বার্থের বিনিময়ে তারা সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। আর সেই কারণেই আজকের এই পরিণতি—যেখানে রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা সবকিছুই পরিণত হয়েছে একটি নির্মম প্রহসনে।

মইনুল হক

ডেট্রয়েট, মিশিগান।

আরো সংবাদ ও বিশ্লেষণ

অন্যান্য ট্যাগ সমূহঃ

জনপ্রিয় আর্টিক্যাল