২১শ শতকের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে যেসব একাডেমিক কাজ ভবিষ্যতে রচিত হবে, সেগুলোর অনেকই সম্ভবত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরকে একটি নির্ণায়ক মোড় হিসেবে বিবেচনা করবে—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও তার বাইরের রাজনৈতিক বিকাশ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে। গাজায় শুরু হওয়া সেই যুদ্ধ দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক—এবং শেষ পর্যন্ত ১২ দিনের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইরানে পৌঁছে যায়। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া দ্বিতীয় দফার যুদ্ধ প্রথম সংঘর্ষে অনিষ্পন্ন থেকে যাওয়া উত্তেজনা ও দ্বন্দ্বকে আবারও জীবিত করে তোলে, এবং অঞ্চলকে বাধ্য করে নতুন এক হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি হতে।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ ইতোমধ্যেই এমন সব প্রভাব তৈরি করেছে যা আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট, যদিও এখনো ধ্বংসের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি। এই বিস্তৃত সংঘর্ষে সবচেয়ে বড় ক্ষতির বোঝা বহন করেছে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো—যেন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাবের মধ্যে তারা উৎসর্গীকৃত। বাস্তবতা হলো, আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করতে যতটা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ততটা নয়; এমনকি যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব ঘাঁটিগুলোকেও কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রাখতে হিমশিম খেয়েছে।
প্রধান প্রেরণা
পারমাণবিক কৌশল বিশ্লেষক উইলিয়াম ডব্লিউ. কাউফম্যানের মতে, কোনো রাষ্ট্র যখন প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করে, তখন তিনটি মৌলিক উপাত্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও আচরণ, অভ্যন্তরীণ ও মিত্র জনগোষ্ঠীর মনোভাব, এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অতীত কার্যক্রম বা রেকর্ড। এই কাঠামোর আলোকে দেখা যায়, ২০০০ সালের শুরুর দিক থেকেই ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ স্পষ্টভাবে তীব্র হয়ে উঠেছিল। একই সময়ে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ধারণা ২০০৬ সাল থেকেই ইসরায়েলের কৌশলগত এজেন্ডায় স্থান পায়। গত ১৫ বছরে অঞ্চলের অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে এই বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করলে স্পষ্ট হয়—আমরা এমন এক ধারাবাহিকতার সাক্ষী, যার পূর্বাভাস অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল।
আরও বৃহত্তর ও স্বাধীন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়েই ইরানে শাসন পরিবর্তনকে এমন একটি “সোনালী চাবি” হিসেবে দেখে, যা একসঙ্গে বহু লক্ষ্য পূরণ করতে পারে—অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন এবং জ্বালানি ভূরাজনীতিকে নিজেদের পক্ষে পুনর্বিন্যাস। ইসরায়েল ও ইরানের নিরাপত্তা মতাদর্শের বাস্তব প্রয়োগ এই হিসাবকে আরও দৃঢ় করে। ইরাক আক্রমণের পর থেকে ইরান অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর মাধ্যমে পারস্য উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তার করেছে—তাদেরকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে সক্ষম করে তুলেছে, এবং কার্যত সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেন হয়ে ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলেছে।
ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের শেষ স্তর হিসেবে ছিল উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ও তাদের জ্বালানি উৎপাদন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা—যেসব দেশ বিশ্বের ২০ শতাংশেরও বেশি তেল ও গ্যাস সরবরাহ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলা এবং হরমুজ প্রণালীর বিঘ্ন ঘটানোর মাধ্যমে ইরানের অসম যুদ্ধ কৌশল পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হয়ে ওঠে।
ইসরায়েলের সম্প্রসারণ ও সংঘাতের বিস্তার
ইসরায়েলের সংঘাত বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি তার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা মতবাদ। বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের পর, ইসরায়েল তার প্রতিরোধ নীতিকে অঞ্চলজুড়ে প্রত্যক্ষ সামরিক আঘাতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলে। লক্ষ্য—তার চারপাশে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র ও অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির “শত্রু প্রাচীর” ভেঙে ফেলা এবং নির্বাচিত কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের এক নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
এই গতিশীলতাই ইসরায়েল ও ইরান—উভয়কেই তাদের নিজ নিজ সীমানার বাইরে সংঘাত চালিয়ে যেতে বাধ্য করছে। যখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে এই সমীকরণে যুক্ত করা হয়, তখন ইরবিল থেকে উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পতিত ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ অনুসরণ করা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনের কঠিন বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ শুরু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল—অল্প ব্যয় ও কম সময়ে অঞ্চলের একাধিক সমস্যার সমাধান করা। এই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে শাসন পরিবর্তন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন হয়ে উঠেছে।
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নতুন কোনো গণঅভ্যুত্থান ঘটার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে শাসনবিরোধী অভ্যুত্থান অনুপস্থিত থাকলে তৃতীয় কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এছাড়া, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিচালনায় দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে—হিজবুল্লাহর সক্ষমতা এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ। ইসরায়েলের উত্তরে হিজবুল্লাহর হামলা এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ইরানের আঘাতের মাত্রা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ইতোমধ্যেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।
ফলে, ইরানে শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠন বা পুনঃসংহত হওয়ার ঝুঁকি এখন বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবেই সামনে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অঞ্চল, এমনকি পুরো বিশ্ব—আরেকটি যুদ্ধের ধাক্কা সহ্য করতে পারবে বলে মনে হয় না, বিশেষ করে যখন বর্তমান সংঘাতের ধ্বংসস্তূপ ক্রমেই জমা হচ্ছে।
যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়নে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লাগতে পারে। এই সময়ের মধ্যে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এমনকি ইরানের শাসনব্যবস্থা পতন হলেও, হরমুজ প্রণালী ও উপসাগরীয় তেল অবকাঠামোর ঝুঁকি বহু বছর ধরে বহাল থাকতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্ন একটিই—ইরানকে কতদূর পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া হবে? যদি শাসনের ওপর চাপ আরও বাড়ানো হয়, তবে অঞ্চল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি উভয়ের জন্যই সামনে অপেক্ষা করছে অত্যন্ত কঠিন সময়। কারণ এই সংকট এতটাই বৃহৎ যে, শুধু স্থলবাহিনী মোতায়েন করা বা পারস্য উপসাগর উপকূলে ইরানের A2/AD সক্ষমতা দুর্বল করলেই এর সমাধান সম্ভব নয়।
২০২৬ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত ইসরায়েলি গণমাধ্যমে নেতানিয়াহুর নামে প্রচারিত কিছু মন্তব্যে দেখা যায়—তিনি মসাদের সেই মূল্যায়নে হতাশ, যেখানে ধারণা করা হয়েছিল যে ইরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে। এটি নেতানিয়াহুর মতো একজন রাজনীতিকের জন্য অপ্রত্যাশিত কিছু নয়; নির্বাচন ঘনিয়ে এলে নিজের দায় আমলাতন্ত্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তার জন্য নতুন কিছু নয়।
শেষ পর্যন্ত, বাস্তবতা স্পষ্ট—যুদ্ধটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে কল্পনা করেছিল, সেভাবে এগোচ্ছে না। একটি শাসনব্যবস্থা পতনের লক্ষ্যে এমন এক অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করা, যার প্রতিধ্বনি পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে, নিঃসন্দেহে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
— গোকান বাতু
লেভান্ট স্টাডিজ বিশেষজ্ঞ, ORSAM

