এক-এগারোর দুঃস্বপ্ন

নির্বাচিত কলামএক-এগারোর দুঃস্বপ্ন

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বিকালে বাংলাদেশের ওপর যে জরুরি অবস্থা চাপিয়ে দেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ, সেদিন সন্ধ্যায় তা বিরোধিতা করার সুযোগ পেয়েছিলাম পরম করুণাময় আল্লাহর অসীম দয়ায়। আল্লাহতায়ালা যে সে সুযোগ কাজে লাগানোর সাহস আমাকে দিয়েছিলেন, সেজন্য কৃতজ্ঞতায় তার কাছে আজও মাথা নোয়াই। ১/১১ নামে খ্যাত বা কুখ্যাত সেদিন পড়ন্ত বিকালে টেলিভিশনের পর্দার নিচের দিকে চলন্ত অক্ষরে প্রচার হয়ে যায় যে, দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। আমার সহকর্মীদের সঙ্গে সেই সম্প্রচার দেখে আমার দেশে প্রত্যাবর্তন অকল্পনীয় অবস্থায়। বোধহয় তার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার ভেতর বিবিসির লন্ডন অফিসের বাংলা বিভাগ থেকে ফোন এলো, বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার তাদের অনুষ্ঠানে টেলিফোনে একটি সরাসরি সাক্ষাৎকার দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার বিষয় হবে ওই জরুরি অবস্থা ঘোষণা। হঠাৎ মনে পড়ে, লন্ডন থেকে ফোনটি করেছিলেন বিবিসিতে সাবেক সহকর্মী মানসি বড়ুয়া। তাদের প্রস্তাব রাজি হলাম ঠিকই, কিন্তু মনে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল, কি বলবো বা কি বলতে কি বলে ফেলি। সেই দ্বিধার কথা মানসি বড়ুয়াকে বললামও। এও উল্লেখ করলাম, ঘটনাটি ঘটিয়েছেন সেনানায়করা, কাজেই এটা শুধুই জরুরি অবস্থা জারি নয়।

তবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা প্রয়োগ করার বিধিগুলো এখনো আসেনি, তাই সব কথা খোলাসা করে বোঝা যাচ্ছিল না এই মুহূর্তে। আশির দশকের শুরু দিকে যখন বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন দোর্দণ্ড প্রতাপে চলতে থাকে, তখন থেকে বিবিসিতে মানসী দি’র সঙ্গে কাজ করে আসছি। তিনি ঠিক ধরে ফেললেন, কি বলতে চাইছি। বোধহয় এও অনুমান করেছিলেন, ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন সম্পর্কে রিপোর্টিং করার সময় বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় আমাকে যে গ্রেফতার করা হয়েছিল, সে কথাও মনে পড়েছে, কারণ আমার কথা উঠতেই তিনি বললেন, “আতাউস সামাদ ভাই, আপনারা বাংলাদেশের ভেতরে কি ঘটতে দেখছেন, আর এখনকার পরিস্থিতিতে আপনারা কি ভাবছেন, সেটা জানতে পারলে আমাদের শ্রোতাদের জন্য মঙ্গল হয়।” ফলে তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম।

১১ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখে বিবিসির সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার বাংলা অনুষ্ঠানে সরাসরি প্রচারিত সাক্ষাৎকারে আমি বলেছিলাম, ওই জরুরি অবস্থা জারি করার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন, যা ২২ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখে অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল, সেটি স্থগিত বা বাতিল করে দেওয়া। তখন বোধহয় আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বয়কট করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে কি দেশ সংঘাতের মধ্যে পড়ত না, অর্থাৎ দেশে কি এখন ‘শান্তি ফিরবে না’? সেই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলেছিলাম, জরুরি অবস্থা জারি হলে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়, কারণ অনেকগুলো মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়ে যায়। এর মধ্যে রাজনৈতিক কার্যকলাপও রয়েছে। ফলে শুধু নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে তা নয়, গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডও বন্ধ হয়ে যাবে। ভারতে ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করার পর যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা সুখকর নয়। সেদিন অল্প সময়ের সাক্ষাৎকারে সম্ভবত  এও বলেছিলাম, জাতীয় নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখের আগে যে ১০ দিন সময় পাওয়া যাচ্ছিল, তার মধ্যে রাষ্ট্রপতি এবং বিভিন্ন দলের নেতারা একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে পারতেন।

১১ জানুয়ারি ২০০৭-এর পরের সপ্তাহগুলোতে বেশ কয়েকবার বিবিসিসহ বিদেশি আরও দুটি টিভি চ্যানেলে দেশের জরুরি অবস্থার সরকারের বিভিন্ন দিক ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মতামত দিতে হয়েছিল। সেগুলোতে প্রায় প্রতিবারই আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি, (১) দেশে নির্বাচন অনিশ্চিত (২) জনপ্রতিনিধিত্ববিহীন সরকার দেশের সমস্যা সমাধান করতে পারবে না, কারণ তারা জনগণ কি চায় তা বুঝতেই পারবে না। (৩) জরুরি বিধিমালা এমনভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, যার ফলে দেশে মানবাধিকার থাকছে না এবং গণতান্ত্রিক চর্চাও করা যাচ্ছে না। সে সময় একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করতে থাকেন নিউএজের সম্পাদক নুরল কবির, মানবাধিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, সাবেক আমলা আসাফউদ্দৌলা ও আকবর আলি খান এবং তৎকালীন সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান (নয়া দিগন্ত পত্রিকায় তার কলামে)। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ এবং তার সামরিক সহযোগীরাও তাদের কঠোর চেহারা দেখাতে বেশি দেরি করেননি। নয়া সরকারপ্রধান ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ সিএসপি মারফত দুর্নীতি দমন ও রাজনৈতিক সংস্কারের ধুঁয়া তুলে একদিকে শুরু করেন রাজনীতিবিদদের ওপর নিপীড়ন যা ছড়িয়ে গিয়েছিল দেশজুড়ে মূলত বিএনপি নেতা ও সমর্থকদের ওপর। শুদ্ধ ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও নির্বাচন সংস্কারের নামে শুরু হয় কালক্ষেপণ।

ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে মাইনাস টু ফর্মুলা। এই মধ্যে জেনারেল মইন উ আহমেদ প্রকাশ্যে বলে বসেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে, সেটাকে লাইনের ওপর আবার বসাতে একটি বড় ক্রেন দরকার এবং তারা সেই কাজটাই করছেন। ওই সময় দুর্নীতি দমনসহ নানা মামলায় যাদের ধরা হচ্ছিল তাদের অনেককেই সামরিক গোয়েন্দাদের জেরা কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল, অপমান করা হয়েছিল, দৈহিক নির্যাতন করা হয়েছিল এবং লুকানো সম্পদ পুনরুদ্ধারের নামে টাকা আদায় করা হয়েছিল আর অসত্য মামলা লাগানো তো হয়েছিলই। ওই সময় পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হয়েছিল যে, গ্রেফতারকৃতদের জামিন দেওয়ার পক্ষে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে পত্রিকার সম্পাদকীয় প্রকাশ করতেও শঙ্কিত হতেন কোন কোন সহকর্মী। এরই মধ্যে কিছু সাহসী রিপোর্টার সরকারের উপদেষ্টাদের কাছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন এবং এজন্য ধমকও খেতেন। যেমন একবার তৎকালীন আইন উপদেষ্টা তাদের প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, আপনারা নির্বাচন করে জানতে চাইছেন, তার আগে রাজনীতিবিদদের গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, তাদের পরিবর্তন হয়েছে কিনা। তা না হলে নির্বাচনের পরিবেশ হবে কি করে? আর তারপর গণতন্ত্র বা টিকবে কি করে? আমরা তো শুধু একটি নির্বাচন দেওয়ার জন্য আসিনি।

একই সময়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বহু জায়গায় হোটেল, দোকানপাট তুলে দেওয়া হয়। ফলে বিশাল এক জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে যায়, আর অর্থনীতিতে আসে স্থবিরতা। সেই সময় এরকমভাবে যেসব ক্ষতি হয়েছিল তার প্রতিক্রিয়া আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের অর্থনীতি।

যত দিন যেতে থাকে সৌভাগ্যক্রমে জনগণ ততই ১/১১ ওয়ালাদের প্রতি বিরূপ হয়ে পড়ে। পাল্টা বিএনপি তৈরির চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তথাকথিত সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে কেউ কেউ নাড়াচাড়া করলেও আওয়ামী লীগ নেতারা ঐক্যবদ্ধ থাকেন। উচ্চতর আদালতে রায় হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন তিন মাসের বেশি বিলম্বিত করায় সংবিধান লংঘন হয়েছে। আর এও স্পষ্ট হয়, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আবার চালু করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত দুই বছর দেরি করে একটি নির্বাচন হলো। আর এখন নির্বাচিত সংসদ ও সরকার আছে দেশে।

পেছন ফিরে তাকিয়ে আমি মনে করি, তথাকথিত ১/১১ ঘটনা দেশকে সব দিক থেকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যথা (১) নানা উছিলায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুই বছর ধরে বিলম্বিত রেখে সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। (২) কোন অজুহাত পেলেই কোন না কোন উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তা দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করবেন—এ ভয় দেশে ফেরত এসেছে। (৩) মানবাধিকার ধ্ববং করেও আইন ও বিচারের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, সেই রুঢ় ও নির্মম অঘটন ভাগ্যের অপরিবর্তনীয় অমোচনীয় লিখন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (৪) দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। (৫) নিম্ন বিচারিক আদালতগুলো ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ বলে পরিচিতি পেয়েছে। (৬) দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে গেছে। (৭) নির্বাচন কমিশন স্বাধীন নয়, এই ধারণা জোরদার হয়েছে। (৮) অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। (৯) ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ভীতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। (১০) রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। (১১) কয়েকটি বিদেশি শক্তিকে জনগণ সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে। তবে জাতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই কারণে, দুই বছর তাকে বেআইনি শাসকদের অধীনে থাকতে হয়েছে—এই মর্মপীড়া থেকে তাদের রেহাই হচ্ছে না।

 ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯-এর ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত যে ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ সরকারপ্রধান ছিলেন, তিনি যে বিদেশি পাসপোর্টধারী এবং এর ফলে ওই পদে অযোগ্য—এ তথ্যটি এখন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো। এক কথায় বলতে গেলে, ১/১১-তে দীর্ঘমেয়াদি অসাংবিধানিক তথা অবৈধ শাসন দেশের ওপর চেপে বসেছিল, তা আমাদের নৈতিকতা বোধকে ব্যঙ্গ করবে এবং মানসিকভাবে পঙ্গু করে রাখবে বহুদিন।

২০০৭-এর ১১ জানুয়ারির সেনা আরোপিত জরুরি অবস্থা দেশের রাজনীতিবিদদের কপালে এক কলঙ্কের তিলক এঁকে দিয়েছে। তার কারণ, একটি রাজনৈতিক সমস্যাকে তারা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করলেন না। দ্বিতীয়ত, একটি অসাংবিধানিক এবং অরাজনৈতিক শক্তি দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলেও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিরোধ করলেন না। তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাদের প্রশংসা করতে কুন্ঠিত হবে অবশ্যই।

বিএনপি ১/১১ দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করেছে। কিন্তু সে দিনটিতে যে অগণতান্ত্রিক শক্তি দেশের সরকার দখল করেছিল, তারা এবং তাদের সঙ্গে হাত মেলালেন যে রাষ্ট্রপতি, তারা তো বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের স্নেহধন্য লোকজন ছিলেন। দ্বিতীয়ত, হ্যাঁ করে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার বয়স দুই বছর বাড়িয়ে দিয়ে বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার প্রধান করার পথ তৈরি করে বিরোধের সূচনা করেছিলেন বিএনপি।

এটি সত্যি কথা, পরবর্তী সময়েও তারা আলোচনায় কোন নমনীয়তা দেখায়নি। এ প্রসঙ্গে এও বলা দরকার, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সঠিকভাবে পূরণ না করেই নিজে সরকারপ্রধান বনে গিয়েছিলেন। মূলত তার ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ১/১১-এর জন্য দায়ী। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা যায়, তৎকালীন নির্বাচন কমিশন যদি তাদের মিত্র জেনারেল এরশাদের সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীতা বাতিল না করত তাহলে কি তারা নির্বাচন বর্জন করত?

আতাউস সামাদ

১৩-০১-২০১০

আতাউস সামাদ বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। তিনি দীর্ঘদিন BBC-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে বিশ্বরাজনীতি ও বাংলাদেশের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর লেখায় গভীর বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমালোচনামূলক দৃষ্টির জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।

আরো সংবাদ ও বিশ্লেষণ

অন্যান্য ট্যাগ সমূহঃ

জনপ্রিয় আর্টিক্যাল