মানব জীবন কি কোনো ছেলে খেলা? মানুষের হাসি, কান্না, প্রেম, বিরহ, আবেগ, ভালোবাসা, রাগ, অনুরাগ, ঘৃণা – এসবই মানব জীবনের অংশ, অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক জীবনের আবেগ-অনুভূতি যদি এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে লক্ষ-কোটি জীবনের ভাবাবেগ, সুখ-দুঃখ কতোটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা কি ব্যাখ্যা করে বুঝাতে হবে? একটি নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডে কোটি কোটি মানুষের জীবন কে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। তাই রাজনীতি কোনো ছেলে খেলার বস্তু তো নয়ই, উপেক্ষা করার মতো কোনো বিষয়ও নয়।
বাংলাদেশের দুর্বত্তায়িত রাজনীতিকে যারা উপেক্ষা করছেন, তারা নিজেরাও যে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের একটি কারণ সেটা তারা স্বীকার করুন বা নাই করুন তাতে ঘটনার সত্যতার কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। রাজনীতি কে অবহেলার প্রথম প্রতিফল হলো নিজের চেয়ে কম যোগ্যতা সম্পন্ন লোকের দ্বারা শাসিত হওয়া। উন্নত বিশ্বে সভ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যদিয়ে যে রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সেখানে হয়তো ব্যক্তিবিশেষে কিছুটা উদাসীন থাকার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে তাদের এই সুন্দর ও পরিপাট রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থা অনেক সংগ্রাম ও ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে আজকের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের ষোলকলাপূর্ণ হয়েছিলো ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে। প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কি হাসিনা ছাড়া অন্যান্যরা ফিরিশতা ছিলো? না, তা ছিলো না। কিন্তু মাত্রা, গুণ ও পরিমাণগত দিক থেকে এমনকি হাসিনার প্রথম মেয়াদও বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট আমল থেকে অনেক, অনেকগুণ ভালো ছিলো, অন্যদের কথা নাইবা বললাম।
মূল প্রসঙ্গে আসি, জুলাইয়ের গণবিস্ফোরণ একদিনে সংগঠিত হয়নি। এটা ছিলো মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোবের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ইতিহাসের অন্যান্য ফ্যাসিস্ট শাসকদের মতোই ছিলো হাসিনার শাসন কৌশল – সেটা হলো জনমনে ব্যাপক ভীতি উৎপাদন করা, মানুষের কন্ঠকে রোধ করে রাখা। এই কৌশল যে ব্যর্থ হবে সেটা হাসিনাও জানতো, কিন্তু এভাবে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করা যায় এবং সে ধারণা করেছিলো এভাবে তার জীবনের বাকী দিনগুলো অন্ততঃ ক্ষমতায় থেকেই কাটিয়ে যেতে পারবে।
আমরা যারা ১/১১ এর পর থেকেই ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে তাদের কাছে ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রাম অনেক দীর্ঘ ছিলো এবং আমাদের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। সেই থেকে আমাদের কে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ কিংবা আদর্শিক নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন জনাব মাহমুদুর রহমান। এজন্যেই মাহমুদুর রহমানকে আমরা জুলাই বিপ্লবের নিউক্লিয়াস বলে থাকি। তিনি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের সিপাহসালার। পিনাকী দা আমাদের শিবিরে যোগ দেবার পরে দক্ষ কমরেডের পরিচালনায় নবপ্রাণ সঞ্চারিত হয়েছিলো আন্দোলনে। যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের শানে-নজুল জানে না তারাই বিপ্লব নাকি গণঅভ্যুত্থান এনিয়ে তর্ক করে। হাসিনা কে উৎখাত করা ছিলো বিপ্লবের প্রথম লক্ষ্য। সেটা আমরা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি কিন্তু আমাদের মঞ্জিল অনেক দূরে, লড়াই সুদীর্ঘ।
বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লবের চেয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবের একটি ভিন্ন চরিত্র রয়েছে। এই বিপ্লবের মূলচালিকা শক্তি ছিলো ন্যারেটিভ তৈরী করা এবং কোনো গেরিলা কৌশল ছিলো না। সেটা শুরু করেছিলেন মাহমুদুর রহমান, চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন পিনাকী দা। বাংলাদেশের অনেক মানুষ উনাদেরকে ঠিকভাবে চিনতে না পারলেও ভারতীয় আধিপত্যবাদ জানে বাংলাদেশে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ কে এবং কারা। ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সালের শেষ পর্যন্ত হ্যাক হয়ে যাবার আগপর্যন্ত জনপ্রিয় ফেইসবুক পেইজ “দেশ আমার, মাটি আমার” এর এডমিন ছিলো এই অধম। মেজর ডালিমের লেখাগুলো তার ওয়বেসাইট থেকে নিয়ে অনেকগুলো গুগল ব্লগ একাউন্ট ও পিডিএফ আকারে ছড়িয়ে দেবার কাজটি এই অধমই করেছিলো। বিনা অনুমতিতে করেছিলাম, আশা করি মেজর ডালিম ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো উনার লেখাগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া। ২০১০-১২ সাল পর্যন্ত “জাতীয়তাবাদী প্রবাসীদল” নামে যে ফেইসবুক পেইজটি অনেকেই দেখেছেন সেটারও এডমিন ছিলাম। সেখানে বেগম জিয়ার বক্তব্যগুলো পত্রিকার স্ক্রীনশট ও বিবরণ আকারে প্রকাশিত হতো।
কেনো নিজের জীবনের বিরাট একটা সময় এভাবেই কাটিয়ে দিলাম? তার উত্তর দিয়ে গেছেন জুলাই বিপ্লবের শহীদগণ, আপনারা সেই উত্তর শোনতে পাচ্ছেন তো? তারা যে কারণে বুলেটের সামনে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন ঠিক একই কারণে জনাব মাহমুদুর রহমান, পিনাকী দা সহ সবাই লড়াই করে যাচ্ছেন। মাহমুদুর রহমান আমার কাছে শুধু একজন মহান ব্যক্তিত্বই নয়, আমার কাছে তিনি incarnation of truth, ethics & justice.
পিনাকী দা’র কাছে আমি প্রতিদিনই ঋণী। প্রতিদিন এই ঋণের দায় বেড়ে চলেছে। আমার অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার জন্যে যে কাজটি আমি করতে পারিনি, সে কাজটি তিনি করে যাচ্ছেন প্রতিদিন। বিশ্রাম, ক্লান্তি, ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন সবকিছু কে উপেক্ষা করে। মা, মাটি আর মানুষের জন্যে কতোটা দরদ থাকলে বিরামহীন ভাবে এই সংগ্রাম চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেটার স্বরূপ অনুধাবন করতে হলেও দেশ ও দেশের মানুষের জন্যে আপনার অকৃত্রিম ও অগাধ ভালোবাসা থাকতে হবে। যারা পিনাকী দা’ কে হেয় বা তাচ্ছিল্য করেন এবং নিজেদের তালেবর দেশপ্রেমিক মনে করেন, তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ রইলো, “পিনাকী দা’ যে কাজটি বছরের পর বছর ধরে করে যাচ্ছেন সেটা আপনারা মাত্র ৯০ দিন করে দেখান”।
দীর্ঘ সংগ্রামের একটি মাহেন্দ্রক্ষণ ছিলো জুলাই। জুলাইয়ে যারা ছিলেন তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। যে সূর্য সন্তানরা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তারা আমাদের আত্নার আত্নীয়, আমাদের ভালোবাসার রক্তকরবী। তাদের আত্নত্যাগ স্বীয় জীবন ও সত্ত্বাকে অতিক্রম করে গেছে। লাল সালাম কমরেডগণ!
হ্যাঁ, জুলাই বিপ্লব শেষ হয়নি। আমরা মাত্র একটি ধাপ অতিক্রম করেছি। এই যাত্রায় যেমন জানবাজ যোদ্ধাগণ লড়াই করেছেন ঠিক তেমনি ভাবে শেষ পর্যায়ে যুক্ত হয়েছিলেন কিছু গ্লামারাস চরিত্র। কিন্তু সেই গ্লামারাস চরিত্রদেরকেও আমরা অবহেলা কিংবা অস্বীকার করি না।
নবারুণ ভট্টাচার্য কতো সুন্দর করেই না লিখেছেন,
“আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব
বুকের মধ্যে টেনে নেব কুয়াশায় ভেজা কাশ বিকেল ও ভাসান
সমস্ত শরীর ঘিরে জোনাকি না পাহাড়ে পাহাড়ে জুম
অগণিত হৃদয় শস্য, রূপকথা ফুল নারী নদী
প্রতিটি শহীদের নামে এক একটি তারকার নাম দেব ইচ্ছেমতো
ডেকে নেবো টলমলে হাওয়া রৌদ্রের ছায়ায় মাছের চোখের মতো দীঘি
ভালোবাসা — যার থেকে আলোকবর্ষ দূরে জন্মাবধি অচ্ছুৎ হয়ে আছি —
তাকেও ডেকে নেব কাছে বিপ্লবের উৎসবের দিন”।
জুলাই বিপ্লব অনেকের কাছে অন্ধের হাতি দেখার মতো। কারো কাছে দড়ির মতো, কারো কাছে কোলার মতো, কারো কাছে খাম্বার মতো। এজন্যেই অনেক হোমরাচুমরা নেতাদেরকে একেক সময় একেক রকম কথা বলতে দেখবেন। কারণ তারা সামগ্রিকভাবে জুলাই বিপ্লবকে না ধারণ করে, আর না অনুধাবন করতে পারে।
সবকিছু ছাড়িয়ে আদর্শিক সংগ্রাম যখন নিজের জাগতিক অস্তিত্বের চেয়েও বড় হয়ে উঠে তখনই মানুষ বীরশ্রেষ্ঠ আবু সাঈদের মতো বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। বলে উঠে,
“বুকের ভিতর দারুণ ঝড়
বুক পেতেছি গুলি কর”।
জুলাই বিপ্লব আমাদের ভালোবাসা ও রক্তে লেখা এক মহাকাব্য। এই মহাকাব্য লেখবার কালে জুলাই পরবর্তী সময়ে আমরা নিজেদের কে আবারো তৈরী করে নিচ্ছি। যেমনটি ফরহাদ মজহার বলেছেন,
“আমার এখন তৈরী হবার সময়-
আমি মিস্ত্রির মতো নিজেকে মেরামত করে নিচ্ছি
র্যাঁদায় ঘষে, করাতে কেটে, ধারালো বাটালি দিয়ে আস্তে আস্তে
নিষ্ঠুর অস্ত্রোপচারে খসে যাচ্ছে আমার দোদুল্যমানতা
আমার নড়বড়ে পিছুটানগুলোকে পেরেক মেরে গেঁথে এসেছি পেছনে
পরিত্যক্ত করিডোরে
আমার এখন তৈরী হবার সময়।
আমি মজবুত করে নিচ্ছি আমার নাজুক ইন্দ্রিয়ের গ্রন্থি
নতুন করে বুনে নিচ্ছি আমার স্নায়ুতন্ত্র
আমি জেগে উঠছি নিজের ভেতর থেকে নিজে”।
আগামী লড়াই যদি আরো কঠিন হয়, তবু আমরা পিছপা হবো না। কোনো দ্বিধা থাকবে না, কোনো সংশয় থাকবে না। যে বিপ্লবীরা রক্তের দামে স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তি কিনতে জানে তারা বিপ্লবের মহাকাব্য রচনা করবেই। তাদের হাত ধরেই জুলাই বিপ্লব পূর্ণতা পাবে।
মইনুল হক
ডেট্রয়েট, মিশিগান।

