যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র যখন তেহরানে ঝরে পড়তে শুরু করল, তার কিছুক্ষণ পরই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চারদিকে ছুটে গেল—কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটির দিকে। এসব দেশের সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আর সম্ভবত সেটাই ছিল প্রথম ধাক্কা থেকে বেঁচে যাওয়া ইরানি নেতৃত্বের একটি উদ্দেশ্য—ভয় সৃষ্টি করা। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদেরকে তাদের নিরাপত্তা জোট নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করা তেহরানের কৌশল হতে পারে।
২০১০ সালে যখন আফগানিস্তানের বিভিন্ন সামাজিক, সরকারি ও উপজাতীয় স্বার্থের জটিল মানচিত্রটি প্রকাশ্যে আসে, তখন বেশিরভাগ মানুষ মাথা নাড়িয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। সেই কুখ্যাত ‘কাউন্টারইনসার্জেন্সি (COIN) স্প্যাগেটি চার্ট’ ছিল ভয়াবহ রকম জটিল—এবং প্রায় অমীমাংসিত। একটি মাত্র পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইডই দেখিয়ে দেয়, এক কোণে কোনো উদ্দীপনা তৈরি হলে কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া অন্য এক দৃশ্যত অপ্রাসঙ্গিক অংশে গিয়ে প্রকাশ পেতে পারে। আর সেটি ছিল কেবল একটি দেশের ছবি।
এখন কল্পনা করুন—আজকের পৃথিবীর জোট, চুক্তি, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বন্ধন ও ধর্মীয় সংযোগ নিয়ে একটি চার্ট কেমন হবে। সেটি এতটাই জটিল হবে যে পুরো কাঠামোটি কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত ও পারস্পরিক ক্রিয়াশীল তা কেউই সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারবে না। যদি কোনো একটি পক্ষ সংঘাতকে আরও উস্কে দেয়, তাহলে কে কে এতে জড়িয়ে পড়বে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন এক সময়ে আমরা বাস করছি, যখন পারমাণবিক অস্ত্রগুলো ‘হেয়ারপিন-ট্রিগার’ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে; ফলে আসলে কী ঘটছে প্রধান খেলোয়াড়রা তা বুঝে ওঠার আগে মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আমাদের সভ্যতা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আর যদি কেউ বেঁচেও যায়, সেটা হবে নিছক ভাগ্যের জোরে। এবং যারা বেঁচে থাকবে, তারাও হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে জানতে পারবে না—পৃথিবীর শেষটা ঠিক কোথা থেকে শুরু হয়েছিল।
আজকের বৈশ্বিক পরিস্থিতি অদ্ভুতভাবে ১৯১৩ সালের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপীয় নেতারা এক জটিল জোটব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। ফ্রান্স ও রাশিয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। জার্মানি ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরির মধ্যেও ছিল একই ধরনের সমঝোতা। আবার সার্বিয়ার স্লাভ জনগণের সঙ্গে রাশিয়ার সাংস্কৃতিক বন্ধনও ছিল দৃঢ়।
ফলে, ১৯১৪ সালের জুনে যখন সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদীর হাতে ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড ও তার স্ত্রী নিহত হন, তখন সেই ঘটনাকে ঘিরে সৃষ্ট কূটনৈতিক সংকট এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরির সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা রাশিয়াকে যুদ্ধে টেনে আনে। রাশিয়ার সেনা সমাবেশ জার্মানিকে প্রস্তুত হতে বাধ্য করে। অল্প সময়ের মধ্যেই জার্মানি রাশিয়া, ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। জার্মান বাহিনী যখন লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়ামে প্রবেশ করে, তখন গ্রেট ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে—এবং প্রকৃত অর্থেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সেই সময়ের আন্তর্জাতিক জোটব্যবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে, ইউরোপের এক প্রায় বিস্মৃত কোণে সামান্য একটি ধাক্কাই পুরো কাঠামো ধসে পড়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
আজকের বিশ্ব অনেক বেশি জটিল। ১৯১৩ সালে প্রায় ৬১টি সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল, আর মূল খেলোয়াড় ছিল ইউরোপের বড় সাম্রাজ্যগুলো—গ্রেট ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানি। আজ পৃথিবীতে ১৯৫টি দেশ এবং প্রত্যেকেই নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ নিয়ে বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে কতগুলো ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ ঘটনা এই ভূ-রাজনৈতিক জালকে কাঁপিয়ে দিয়ে একেবারে ভেঙে ফেলতে পারে—তার কোনো হিসাবই করা সম্ভব নয়।
আরেকটি বিষয়ও ভেবে দেখার মতোঃ আমরা হয়তো ইতিমধ্যেই একটি বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছি। ইতিহাসবিদ ভিক্টর ডেভিস হ্যানসন লিখেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে আমরা আজ যেভাবে দেখি, তা আসলে ‘পশ্চাৎদৃষ্টি’র ফল। সেই সময় যারা ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করছিল, তাদের কাছে শুরুতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল বিচ্ছিন্ন সীমান্ত সংঘাত ও আঞ্চলিক দখলদারিত্বের একটি ধারাবাহিকতা মাত্র। ১৯৩১ সালে জাপান মানচুরিয়া আক্রমণ করে, ১৯৩৭ সালে চীনের সঙ্গে সংঘাত বিস্তৃত করে। ১৯৩৫ সালে ইতালি ইথিওপিয়া আক্রমণ করে। ১৯৩৬ সালে জার্মানি রাইনল্যান্ডে পুনরায় সামরিক উপস্থিতি স্থাপন করে, ১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়াকে অঙ্গীভূত করে এবং ছয় মাস পর সুদেতেনল্যান্ড দখল করে।
আজকের বাস্তবতাও কি খুব ভিন্ন? রাশিয়া এখনো ইউক্রেনে যুদ্ধ করছে। গাজা এখনো এক উন্মুক্ত ক্ষত। যুক্তরাষ্ট্র সাহসী সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করেছে। আর এখন ইরানের শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অবশিষ্ট কর্মকর্তারা মনে হচ্ছে পুরো অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এমন প্রতিটি দেশের বিরুদ্ধে আঘাত হেনে একটি বৃহত্তর যুদ্ধ উসকে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এতে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসেঃ আমরা কি এখন আরেকটি ‘পার্ল হারবার’ মুহূর্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি?
ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র চীনের দিকে প্রবাহিত তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে। আর এখন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পতনের পর, চীন যেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস হারানোর দ্বারপ্রান্তে। ইতিহাস কি আমাদের কিছু মনে করিয়ে দেয় না? জাপান কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের ওপর হামলা চালিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল? যারা বলবেন—যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, বিশেষ করে তেলের প্রবেশাধিকার হারানোই ছিল এর মূল কারণ—তারা সঠিক উত্তর দিচ্ছেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যারা নির্মাণ করেছিলেন, সেই একই নেতারা সারায়েভোর আগের বছরগুলোতে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলেন। তাদের অনেকেই আলফ্রেড থেয়ার মাহানের সমুদ্রশক্তির গুরুত্ব নিয়ে লেখা পড়েছিলেন। ফলে বহু দেশ বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে ড্রেডনট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে ঝুঁকে পড়ে। হাইরাম ম্যাক্সিমের উদ্ভাবন অস্ত্র নির্মাতাদের আরও কার্যকর মেশিনগান তৈরিতে অনুপ্রাণিত করে। আর সেই সময়ের বিমানচালকেরা কেবলমাত্র কল্পনা করতে শুরু করেছিলেন—যুদ্ধে বিমান কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
১৯১৩ সালে কেউই পুরোপুরি বুঝতে পারেনি শিল্পযুগ যুদ্ধকে কতটা বদলে দিয়েছে। নেতারা তখনো পুরোনো আন্তর্জাতিক নিয়মের মধ্যেই খেলছিলেন—যেখানে যুদ্ধ মানে ছিল সারিবদ্ধ সৈন্যদের নিয়ে সীমিত ও দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘর্ষ। যদি সেই সময়ের নেতারা আগাম দেখতে পেতেন খন্দকযুদ্ধ, বিষাক্ত গ্যাস এবং শিল্পায়িত হত্যাযজ্ঞ—তাহলে তারা কখনোই যুদ্ধের সূচনা উদযাপন করতেন না। তাছাড়া, সেই সময়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেও বঞ্চিত ছিলেন—যা প্রায়ই বেপরোয়া সিদ্ধান্তকে উৎসাহিত করে। ইউরোপের শেষ বড় যুদ্ধ ছিল ১৮৭১ সালে শেষ হওয়া ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ। তার আগে সর্বশেষ বড় সংঘর্ষ ছিল ১৮১৫ সালের ওয়াটারলু।
আজকের পৃথিবীতেও কোনো দেশের নেতা বৈশ্বিক মাত্রার যুদ্ধের সরাসরি অভিজ্ঞতা রাখেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে ৮০ বছরেরও বেশি আগে। যারা এখনো বেঁচে আছেন সেই অল্প কয়েকজন যুদ্ধ-সেনা, তারা শতবর্ষী বা প্রায় সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না—পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ কেমন হবে। এমনকি অলৌকিকভাবে যদি সেটি পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াই হয়, তবুও সুপারপাওয়ারদের মধ্যে একটি প্রচলিত যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হবে—তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো ধারণা কারো নেই।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকদের উচিত বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। আমরা হয়তো এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যাকে ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা’ হিসেবে চিহ্নিত করবেন। অবশ্য, সেটি নির্ভর করছে ভবিষ্যতে কোনো ইতিহাসবিদ আদৌ থাকবে কিনা তার ওপর।
প্রতিটি বোমা বিস্ফোরণ, প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, প্রতিটি যুদ্ধজাহাজে টর্পেডো হামলা—সবকিছুই আমাদের সেই একক ‘ধাক্কা’র দিকে নিয়ে যাচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীর সারায়েভো মুহূর্তের দিকে, যা এই ভঙ্গুর বৈশ্বিক কাঠামোকে ধসিয়ে দিতে পারে। একটি ছোট ভুল হিসাব, একটি বোমা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অন্য দেশের দূতাবাসে পড়া, একটি যাত্রীবাহী বিমান ভুলবশত ভূপাতিত হওয়া—অথবা এমন লক্ষ লক্ষ ঘটনার যেকোনো একটি—পরিস্থিতিকে এমনভাবে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
তবুও, হয়তো এখনো সময় আছে এই বিপর্যয় ঠেকানোর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনী গত দুই মাসে দুটি অসাধারণ সামরিক দক্ষতার প্রদর্শন করেছে—যার জন্য তারা কৃতিত্ব পেতেই পারে। কিন্তু তাদের এটাও মনে রাখা উচিত—বিজয় কখনোই নিশ্চিত নয়। ভাগ্য, নিয়তি এবং প্রতিপক্ষ—সবকিছুই একটি সংঘর্ষের ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি যুদ্ধের অনিশ্চয়তা দূর করে দিয়েছে—এমনটা বিশ্বাস করা সহজ। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ সবসময়ই মানবিক এক প্রক্রিয়া, যা মানুষের লক্ষ্য পূরণেই ব্যবহৃত হয়।
এই মুহূর্তে প্রশাসনের উচিত ইরান-সম্পর্কিত চলমান সামরিক অভিযান দ্রুত সমাপ্ত করা। তারা তাদের অর্জন উদযাপন করতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। কারণ প্রতিটি সামরিক অভিযানই মূলত ভূ-রাজনৈতিক পরিসরে ‘রাশিয়ান রুলেট’-এর মতো—যেখানে একবার ট্রিগার টানা মানেই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে প্রবেশ।
লেখক: ড্যান গ্রাজিয়ার
ড্যান গ্রাজিয়ার স্টিমসন সেন্টারের একজন সিনিয়র ফেলো ও প্রোগ্রাম ডিরেক্টর। তিনি সাবেক মেরিন কর্পস ক্যাপ্টেন, যিনি ইরাক ও আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সামরিক জীবনে নর্থ ক্যারোলিনার ক্যাম্প লেজুনে ২য় ট্যাংক ব্যাটালিয়ন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার টোয়েন্টিনাইন পালমসে ১ম ট্যাংক ব্যাটালিয়নের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সূত্রঃ রেস্পন্সিবল স্টেইটক্রাফট।

