হোমবিশ্বআমেরিকায় পুরুষদের কর্মবিমুখতার নেপথ্যে আসলে কী?

আমেরিকায় পুরুষদের কর্মবিমুখতার নেপথ্যে আসলে কী?

প্রকাশ

তারিখ

বিভাগ

আমেরিকায় পুরুষদের কর্মবিমুখতার নেপথ্যে আসলে কী?

কয়েক দশক ধরে আমেরিকান পুরুষদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার ক্রমাগত কমছে। অর্থনীতিবিদেরা বিষয়টির দিকে অনেকটা মধ্যযুগের গ্রামবাসীদের সূর্যগ্রহণ দেখার মতো করে তাকিয়ে আছেন—বিস্মিত, উদ্বিগ্ন; কিন্তু সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে অনেকটাই ব্যর্থ।

পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ১৯৫০ সালে ২০ বছরের বেশি বয়সী আমেরিকান পুরুষদের ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ হয় কর্মরত ছিলেন, নয়তো সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছিলেন। বর্তমানে এই হার ৭০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লাখ লাখ পুরুষ শ্রমশক্তি থেকে বেরিয়ে গেছেন।

তাঁদের কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কাজ করতে পারছেন না, কেউ আগাম অবসর নিয়েছেন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান একটি অংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর থেকেই নিজেদের সম্পূর্ণ সরিয়ে নিয়েছেন। প্রতিদিনের শ্রম, দায়িত্ব ও প্রতিযোগিতার পরিবর্তে তাঁরা বেছে নিচ্ছেন কোনো কিছু না করার আপাত স্বস্তি।

বছরের পর বছর এই প্রবণতার পেছনে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আবাসনবাজারের ধ্বসের পর নির্মাণ খাত সংকুচিত হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বহু শ্রমনির্ভর কাজ বিলুপ্ত করেছে। বিশ্বায়ন আমেরিকার উৎপাদনশিল্পকে দুর্বল করেছে। কেউ বলেছেন, পুরুষেরা এখন বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকছেন অথবা পরিবারের পরিচর্যার দায়িত্ব নিচ্ছেন। আবার কারও মতে, পরিবর্তিত অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারায় তাঁরা পিছিয়ে পড়েছেন।

সব মিলিয়ে এটি যেন সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের এক বিশাল তালিকা—অর্থনৈতিক অপ্রয়োজনীয়তার এমন এক নিখুঁত ঝড়, যা লাখ লাখ পুরুষকে কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তে ঘরের সোফায় আটকে দিয়েছে।

এরপর সামনে আসে তুলনামূলকভাবে চমকপ্রদ একটি তত্ত্ব—ভিডিও গেম।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক তরুণ ক্রমশ উন্নত ও আকর্ষণীয় ডিজিটাল বিনোদনের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছেন যে তাঁরা কাজকর্ম ছেড়ে দিচ্ছেন। মনে হচ্ছিল, উন্নত গ্রাফিকস কার্ড এবং হাই-ডেফিনিশন আনন্দের কাছে যেন সভ্যতাই পরাজিত হতে চলেছে।

কিন্তু সুবিধাজনক এই ব্যাখ্যার একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে। বর্তমানে নারীরাও পুরুষদের প্রায় সমান হারে ভিডিও গেম খেলেন। গেমিং শিল্পের তথ্য অনুযায়ী, অনেক বয়সসীমায় নারী ও পুরুষ খেলোয়াড়ের সংখ্যা প্রায় সমান। অথচ নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি স্থিতিশীল।

ভিডিও গেমের চরিত্র মারিও যদি সত্যিই কর্মশক্তি ধ্বংসের জন্য দায়ী হয়, তাহলে সে যেন অদ্ভুতভাবে কেবল পুরুষদেরই শিকার হিসেবে বেছে নিচ্ছে। নারীরা যখন বাড়ির ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন, পুরুষেরা তখন দিন কাটাচ্ছেন ভার্চুয়াল মাশরুমের সন্ধানে—এমন ব্যাখ্যা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

শৈশবেই কি তৈরি হচ্ছে পরাজয়ের মানসিকতা?

কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদদের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এ বিষয়ে আরও গভীর এবং অনেক বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে।

গবেষকদের বক্তব্য হলো, বর্তমান শ্রমবাজার দুর্বল বলেই পুরুষেরা কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন—বিষয়টি এত সরল নয়। বরং তাঁরা জীবনের অনেক আগেই একটি তিক্ত সত্য শিখে ফেলেছেন। শৈশবে ছেলেরা তাদের চারপাশে যে অর্থনৈতিক সংকট ও হতাশা প্রত্যক্ষ করে, তা কঠোর পরিশ্রমের মূল্য সম্পর্কে তাদের বিশ্বাসকে স্থায়ীভাবে বিকৃত করে দিতে পারে।

একটি ছেলে যদি বেকার, অর্ধবেকার ও হতাশাগ্রস্ত পুরুষদের মধ্যে বড় হয়; যদি সে দেখে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেও তার বাবা, আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের আয় তেমন বাড়ছে না—তাহলে সে এসব অভিজ্ঞতা স্পঞ্জের মতো নিজের ভেতরে শুষে নেয়।

এমনকি পরবর্তী সময়ে অন্য অঙ্গরাজ্যে চলে গেলেও সেই মানসিক ক্ষত মুছে যায় না। কম প্রত্যাশা ও ব্যর্থতার আশঙ্কা তারা যেন বংশগত রোগের মতো সঙ্গে বহন করে বেড়ায়।

অর্থাৎ পুরুষদের শ্রমবাজার থেকে সরে যাওয়ার বর্তমান সংকটটি শুধু চাকরির অভাবের সংকট নাও হতে পারে। এটি বিশ্বাসের সংকটও হতে পারে—পরিশ্রম করলে জীবনে সত্যিই কোনো উন্নতি হবে কি না, সেই বিশ্বাসের সংকট।

এই সম্ভাবনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ চাকরির পরিসংখ্যান বা বেতনসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের চেয়ে মানুষের বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার ভাঙন মেরামত করা অনেক কঠিন। করছাড় কিংবা জীবনবৃত্তান্ত তৈরির কর্মশালা দিয়ে ভেঙে পড়া মনোবল পুনর্গঠন করা যায় না।

সমাজ ছেলেদের কী বার্তা দিচ্ছে?

গবেষণার ফলাফল এমন কিছু সাংস্কৃতিক প্রশ্নও সামনে এনেছে, যেগুলো অর্থনীতিবিদেরা সাধারণত এড়িয়ে যেতে পছন্দ করেন।

কয়েক দশক ধরে অনেক ছেলেকে এমন এক বার্তার মধ্যে বড় করা হয়েছে, যেখানে পুরুষদের কখনো সুবিধাভোগী নিপীড়ক, কখনো সম্ভাব্য হুমকি, আবার কখনো আধুনিক অগ্রযাত্রার নির্বোধ দর্শক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে বাবাকে প্রায়ই নির্বোধ, স্বামীকে অযোগ্য এবং পুরুষত্বকে এমন একটি সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা অবিলম্বে সংশোধন করা প্রয়োজন।

কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেমি লেভিন ও ড্যানিয়েলা ভিডার্টের গবেষণা অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা যদি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে ছেলেরা যে বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ মূল্য ও ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে, সেটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

একটি সমাজ যদি বারবার তরুণ পুরুষদের বলে যে তাদের প্রয়োজন নেই, তাহলে তাদের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত সত্যিই নিজেদের অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকে না।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই নেতিবাচক বার্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। গত কয়েক দশকে কলেজ ডিগ্রিবিহীন পুরুষদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিপরীতে কলেজশিক্ষিত পুরুষদের আয় বেড়েছে।

ফলে সামাজিক মর্যাদা, আয় ও সুযোগের ব্যবধান ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। কারও জন্য সুযোগের দরজা খুলেছে, আবার অন্যদের জন্য তা আরও সংকুচিত হয়েছে।

এর পরিণতিতে এমন একটি পুরুষ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা ওপরের দিকে তাকিয়ে উন্নতির সিঁড়ি দেখতে পেলেও বুঝতে পারে—সেই সিঁড়ির নিচের ধাপগুলো সম্পূর্ণ কেটে ফেলা হয়েছে।

বাম ও ডানের গতানুগতিক প্রতিক্রিয়া

অনুমিতভাবেই চরম বামপন্থীদের অনেকে এই আলোচনাকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দেখবেন। তথাকথিত ‘নিপীড়কদের’ দুর্দশার প্রতি তাঁরা হয়তো বিদ্রূপাত্মক সহানুভূতি প্রকাশ করবেন।

অন্যদিকে ডানপন্থীদের অনেকে বাস্তবতা বিবেচনা না করেই পুরোনো উপদেশ দেবেন—নিজের জুতার ফিতা ধরে নিজেকেই ওপরে টেনে তুলতে হবে এবং এমন একটি দেশকে ভালোবাসতে হবে, যে দেশ আপনার ব্যাংক হিসাবকে বিনিময়ে কোনো ভালোবাসা দেখায় না।

কিন্তু মানুষকে একটি ব্যবস্থার অংশ হতে হলে সেই ব্যবস্থায় বিশ্বাস করার কারণ প্রয়োজন। প্রয়োজন ন্যূনতম সম্মান এবং এমন একটি বাস্তব অনুভূতি যে আজকের পরিশ্রম আগামীকালের জীবনে প্রকৃত উন্নতি নিয়ে আসবে।

শৈশবের অভিজ্ঞতা যদি কাউকে শেখায় যে কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে সামান্যই অর্জিত হয়, তাহলে শ্রমবাজার থেকে তার সরে যাওয়া বোধগম্য হয়ে ওঠে—যদিও ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই এর পরিণতি ধ্বংসাত্মক।

প্রত্যাশার গভীর সংকট

আমেরিকায় পুরুষদের আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বিয়ের হার হ্রাস এবং শ্রমবাজার থেকে সরে যাওয়া—এসব হয়তো সম্পূর্ণ পৃথক ঘটনা নয়। এগুলো একই অন্তর্নিহিত অসুস্থতার ভিন্ন ভিন্ন উপসর্গ হতে পারে।

আর সেই অসুস্থতার নাম—প্রত্যাশার সংকট।

ভিডিও গেমের তত্ত্বটি অনেকের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল। কারণ সেখানে সমাধান ছিল খুবই সহজ—এক্সবক্স বন্ধ করো, পোশাক পরে কাজে ফিরে যাও।

কিন্তু নতুন গবেষণা আরও অস্বস্তিকর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। একজন পুরুষ ৩০ বছর বয়সে কী করছেন, সেটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—১৩ বছর বয়সে তিনি কাজের মূল্য, জীবনের উদ্দেশ্য এবং সমাজে নিজের অবস্থান সম্পর্কে কী শিখেছিলেন।

মূল লেখকঃ জন ম্যাক গ্লিয়ন

লেখক পরিচিতি: জন ম্যাক গ্লিয়ন একজন লেখক ও গবেষক। তিনি সংস্কৃতি, সমাজ এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণা করেন।

সাম্প্রতিক পোস্ট