প্রত্যর্পণ-চাওয়া আমিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অনথিভুক্ত সাক্ষাৎ—প্রশ্নটি আসলে রাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে। Bloomberg-এর একটি সংবাদ খুব বেশি আলোচনায় না এলেও বাংলাদেশের জন্য সংবাদটির রাজনৈতিক ও নৈতিক গুরুত্ব অনেক বড়।
সংবাদটির শিরোনাম—“Bangladesh Prime Minister Met Labor Tycoon Amin on Malaysia Trip.”
Bloomberg-এর Anders Melin ও Niluksi Koswanage-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুন মাসে মালয়েশিয়া সফরের সময় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশীয় ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম আবদুল নূরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকটি হয়েছে কুয়ালালামপুরের জাতীয় প্রাসাদে। সেখানে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর রামানানও উপস্থিত ছিলেন বলে Bloomberg-কে জানিয়েছেন বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা। কিন্তু আমিনুল ইসলামের উপস্থিতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফরের কোনো নথিতে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর একজন মুখপাত্র Bloomberg-কে প্রাসাদে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে আমিনুল ইসলামের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেছেন, সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল শুভেচ্ছা বিনিময় করেছে। অর্থাৎ সাক্ষাৎ হয়নি—এমন কথা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বলেনি; আবার Bloomberg যে ধরনের সাক্ষাতের কথা বলছে, সেটিও স্পষ্টভাবে স্বীকার করেনি।
সমস্যাটা এখানেই।
আমিনুল ইসলাম যদি নিছক একজন প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হতেন, তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন কি করেননি—তা নিয়ে হয়তো এত প্রশ্নের প্রয়োজন হতো না।
কিন্তু আমিনুল ইসলাম সেই ব্যক্তি, যাঁকে গ্রেপ্তার ও বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের জন্য ২০২৪ সালে বাংলাদেশের পুলিশ মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছিল।
২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশের Interpol National Central Bureau মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিল। আমিনুল ইসলাম এবং Catharsis International-এর মালিক রুহুল আমিনকে ঘিরে ওই তদন্তের অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল অর্থ পাচার, চাঁদাবাজি এবং অভিবাসী শ্রমিক পাচার। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ছিল, শ্রমিকদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থায় তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে Bestinet পরিচালিত Foreign Workers Centralised Management System-এর ব্যবহার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথাও বাংলাদেশ থেকে বলা হয়েছিল।
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। আমিনুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য নেই এবং Bloomberg-ও লিখেছে যে তাঁকে অভিযুক্ত করে কোনো চার্জ দেওয়া হয়নি। Bestinet-ও বরাবরই দাবি করেছে, তাদের প্রযুক্তি শ্রমিক নিয়োগের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার জন্য তৈরি এবং বাংলাদেশে শ্রমিক নিয়োগকারী এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমের জন্য প্রতিষ্ঠানটি দায়ী নয়।
তাই প্রশ্নটি আমিনুল ইসলামকে আগাম অপরাধী ঘোষণা করার নয়।
প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে।
একটি রাষ্ট্র একই ব্যক্তিকে একসময় প্রত্যর্পণ করতে চাইবে, তার প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার বন্ধ করার অনুরোধ করবে, তাঁর বিরুদ্ধে শ্রমিক শোষণ ও পাচারের অভিযোগ তদন্ত করবে—তারপর সেই রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী সেই ব্যক্তির সঙ্গে বিদেশ সফরে অনথিভুক্তভাবে সাক্ষাৎ করবেন; অথচ জনগণকে পরিষ্কার করে জানানো হবে না কেন সাক্ষাৎ হলো—এটা স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় আচরণ নয়।
আরও অস্বস্তিকর ব্যাপার হলো, ২০২৪ সালের সেই উদ্যোগের পরও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটিও অস্পষ্ট।
মালয়েশিয়া ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের পাঠানো নোটিশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছিল। তখন মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য নাকি বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য—সেটি পরিষ্কার করতে আরও তথ্য প্রয়োজন। অথচ ২০২৬ সালের জুনে একই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমিনুল ইসলামকে প্রত্যর্পণের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক আবেদন মালয়েশিয়া তখনও পায়নি।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশের সেই প্রত্যর্পণ উদ্যোগের কী হলো?
২০২৪ সালের উদ্যোগটি কি শুধু একটি পুলিশি তৎপরতা ছিল, যেটিকে পরবর্তী সরকার আর এগিয়ে নেয়নি?
নাকি আমিনুল ইসলামের বিষয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান বদলেছে?
অবস্থান বদলে থাকলে কেন বদলেছে?
আর যদি তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত এখনও বহাল থাকে, তাহলে তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের প্রয়োজন কেন হলো?
এই প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ই ছিল বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্রের প্রস্তুত বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বাজার দ্রুত পুনরায় চালু করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ঠিক একই সফরে সেই শ্রমবাজারের নিয়োগব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলামের উপস্থিতি তাই কেবল একটি সামাজিক ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
কারণ Bestinet কোনো সাধারণ আইটি কোম্পানি নয়।
মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত FWCMS-এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। Bloomberg-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পুরো ব্যবস্থাকে ঘিরে ভয়াবহ ঋণ, অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, মধ্যস্বত্বভোগী এবং সীমিতসংখ্যক এজেন্সির নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ। ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য প্রস্তুত একটি গবেষণা স্মারকের তথ্য উদ্ধৃত করে Bloomberg জানায়, কোনো কোনো বাংলাদেশি শ্রমিকের মালয়েশিয়া যেতে নিয়োগ ব্যয় ৬,৬০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
অর্থাৎ এখানে ব্যবসাটি পণ্য আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা নয়।
এই ব্যবসার অপর প্রান্তে থাকে বাংলাদেশের গ্রামের কোনো দরিদ্র পরিবার। জমি বিক্রি করা বাবা, স্বর্ণ বন্ধক রাখা মা কিংবা কয়েক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়া একজন তরুণ। চাকরির আশায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে অনেকে কাজ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন; অথচ দেশে রেখে গেছেন বিশাল ঋণ।
এই কারণেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এবং একই কারণে আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে, সেটি জানার অধিকারও বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। Bloomberg এপ্রিল মাসে জানিয়েছিল, মালয়েশিয়া Bestinet-এর তৈরি নতুন একটি শ্রমিক নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম—The Universal Recruitment Advanced Platform (TURAP)—ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। এই ব্যবস্থায় সরাসরি নিয়োগের কথা বলা হলেও মালয়েশিয়ার ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে, এর মাধ্যমে Bestinet-এর হাতে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থার আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে কি না।
আর Bloomberg-এর জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান—যিনি আমিনুল ও তারেক রহমানের সেই কথিত সাক্ষাতের সময় উপস্থিত ছিলেন—তিনি এপ্রিলেই Bestinet-এর নতুন ব্যবস্থা ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
ফলে ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে গেলেন, সে সফরে বাংলাদেশি শ্রমিকের বাজার পুনরায় চালুর আলোচনা হলো যেখানে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এবং কুখ্যাত Bestinet-এর প্রতিষ্ঠাতা আমিনুল ইসলাম, যাকে বাংলাদেশ একসময় প্রত্যপর্ণের জন্যে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে আবেদন করেছিল।
এগুলো প্রত্যেকটি আলাদা ঘটনা হতে পারে। আবার এদের মধ্যে নীতিগত কিংবা ব্যবসায়িক যোগসূত্রও থাকতে পারে। প্রমাণ ছাড়া দ্বিতীয়টি ধরে নেওয়া সাংবাদিকতা নয়। কিন্তু এতগুলো সম্পর্কিত ঘটনা সামনে থাকার পর প্রশ্ন না করাটাও সাংবাদিকতা নয়।
সরকারের উচিত তাই খুব সাধারণ কয়েকটি বিষয়ে পরিষ্কার বক্তব্য দেওয়া।
আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশের তদন্ত এখন কোন অবস্থায় আছে? বাংলাদেশ কি এখনও তাঁর প্রত্যর্পণ চায়? না চাইলে সেই সিদ্ধান্ত কখন এবং কেন পরিবর্তিত হয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পূর্বনির্ধারিত ছিল, নাকি ঘটনাচক্রে হয়েছিল? যদি কেবল শুভেচ্ছা বিনিময় হয়ে থাকে, তাহলে কতক্ষণ তা স্থায়ী হয়েছিল? সেখানে শ্রমিক নিয়োগ, Bestinet, FWCMS কিংবা TURAP নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না?
এগুলো কোনো বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়।
এগুলো রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
কারণ বিদেশে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি আমাদের শ্রমিক। তাঁদের ঘাম, ঋণ আর জীবনের ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। এই শ্রমিকদের নিয়োগব্যবস্থা যদি কোনো সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা প্রযুক্তিগত একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে, তাহলে সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সেই ব্যবস্থা ভাঙা—তার সঙ্গে আপস করা নয়।
আমিনুল ইসলাম অপরাধী কি না, সেটি আদালত ও তদন্তের বিষয়।
কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্র তাঁকে নিয়ে কী করছে—সেটি বাংলাদেশের মানুষের জানার বিষয়।
Bloomberg-এর সংবাদটির আসল গুরুত্ব এখানেই।
একজন ব্যবসায়ী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন—এটা বড় খবর নয়।
বড় খবর হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্র যাঁকে একসময় ফেরত এনে তদন্ত করতে চেয়েছিল, সেই মানুষটি কীভাবে মাত্র দুই বছর পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের পরিসরে হাজির হলেন—এবং তাঁর উপস্থিতির কথা সরকারি বিবরণে কেন পাওয়া গেল না।
সরকার একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।
আর যদি সেই ব্যাখ্যা না আসে, তাহলে নীরবতাটাই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেবে।
লেখকঃ মইনুল হক
মইনুল হক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক্টিভিস্ট ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক।
সম্পাদকীয় দ্রষ্টব্য: এটি মইনুল হক এর একটি মতামতধর্মী কলাম। নিবন্ধে উল্লিখিত রাজনৈতিক মূল্যায়ন, অভিযোগ, অনুমান ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস মূল লেখকের নিজস্ব; সেগুলো The Veritas-এর সম্পাদকীয় অবস্থান হিসেবে বিবেচ্য নয়।