ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলবাণিজ্য, হামলা ও হত্যাসহ নানা অপরাধের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ছিল আরও ভয়াবহ—আওয়ামী লীগের আমলে সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির রাজনীতিতে অভিজ্ঞ লোকজনকেই বিএনপিতে টেনে নেওয়া হচ্ছে। পুরোনো সন্ত্রাসীদের শুধু জার্সি বদল হচ্ছে, চরিত্র বদল হচ্ছে না। সেই প্রক্রিয়া এখনো থেমেছে—এমন লক্ষণও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
তখন বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দলটির একটি বহুল ব্যবহৃত জবাব ছিল—তারা তো ক্ষমতায় নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। বরং বিএনপিই উল্টো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলত যে সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিএনপি আরও বলত, দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকার কারণেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। ড. ইউনূস সরকারের উচিত দ্রুত নির্বাচন দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। তাদের বক্তব্য ছিল—একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারই কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোন পরিস্থিতিতে দেশের দায়িত্ব নিয়েছিল, সে কথা বাংলাদেশের মানুষ এত দ্রুত ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রকে ক্রমেই একটি কর্তৃত্ববাদী পুলিশি কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে চরম দলীয়করণ, বিরোধী মত দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের সহযোগী হয়ে ওঠার গুরুতর অভিযোগ ছিল।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শুধু শেখ হাসিনাই দেশ ছেড়ে যাননি; তার শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বহু সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পুলিশ কর্মকর্তাও পালিয়ে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। পুলিশ বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত হয়ে পড়ায় কার্যত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছিল।
এমন একটি ভয়াবহ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের একাংশের বিরুদ্ধে সারা দেশে চাঁদাবাজি, দখল ও নৈরাজ্যে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছিল। অথচ আঙুল তোলা হচ্ছিল ড. ইউনূস সরকারের দিকেই।
এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে প্রায় ছয় মাস হতে চলল। কিন্তু চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, খুন, জখম ও দখলবাণিজ্যের অভিযোগ কমেছে কি?
বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেসব খবর আসছে, তাতে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে—এসব অপকর্ম আরও বিস্তৃত এবং সর্বগ্রাসী রূপ নিচ্ছে।
ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল তাঁর ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজে লিখেছেন—
‘ঝালকাঠির বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীদের খাই খাই বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করছি। ছয় মাসে অনেক খেয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের পাহারার বিনিময় খেয়েছেন, আওয়ামীদের পক্ষে ওকালতি করে খেয়েছেন, আওয়ামীদের বাড়িঘর পাহারা দিয়ে খেয়েছেন, ঠিকাদারি পাহারা দিয়ে খেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে আওয়ামীদের দলে যোগদান করিয়েও খাচ্ছেন। মনে হচ্ছে আপনারা দলটাকেই খেয়ে ফেলবেন।’
খোদ বিএনপির একজন সংসদ সদস্য যখন নিজের দলের নেতাকর্মীদের সম্পর্কে এমন কথা প্রকাশ্যে বলতে বাধ্য হন, তখন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে তা বোঝার জন্য আর খুব বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন।
বিএনপি এখন ক্ষমতায়। সরকার তাদের। প্রশাসন তাদের সরকারের অধীনে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের। পুলিশ তাদের সরকারের নির্দেশে চলছে।
তাহলে নিজ দলের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কেন?
তবে কি মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছেন তারেক রহমান?
আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?
যিনি সংসদে প্রায়ই প্রধানমন্ত্রীর প্রক্সি দেন, অন্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অনুপস্থিত থাকলে তাদের হয়ে উত্তর দেন, এমনকি একজন পূর্ণাঙ্গ আইনমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা দিতেও পিছপা হন না—তিনি নিজের মন্ত্রণালয় কতটা সামলাতে পারছেন?
যদি সামলাতেই পারেন, তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই লেজেগোবরে অবস্থা কেন?
অন্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা বা প্রশ্নের জবাব যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিতে পারেন, তাহলে নিজের মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার জবাব দেবেন না কেন?
জবাব অবশ্য তিনি দিয়েছেন।
সমস্যা হলো, সেই জবাব শুনে বাংলাদেশের মানুষের বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছে—তারা আসলে কোন সরকারের আমলে বসবাস করছেন।
জবাবটি বড় পরিচিত।
যে ধরনের জবাব একসময় সাহারা খাতুন দিতেন।
যে ধরনের জবাব শামসুল হক টুকু দিতেন।
যে ধরনের জবাব আসাদুজ্জামান খান কামাল দিতেন।
সেই একই পুরোনো রেকর্ড—
“দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
সরকার বদলেছে, মন্ত্রী বদলেছে, দলের নাম বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি শুধু ভাষা।
মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের বিরুদ্ধে খুন, রাহাজানি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাণিজ্যের যে ধারাবাহিক অভিযোগ উঠছে, তা ভয়াবহভাবে আওয়ামী লীগ আমলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
তারেক রহমান সরকারের মন্ত্রীদের অনেকের আচরণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতায় এসেই কেউ কেউ বেসামাল আচরণ করছেন, কেউ বেফাঁস মন্তব্য করছেন, কেউ আবার জনঅসন্তোষকে অস্বীকার করে এমন আত্মতুষ্টির ভাষায় কথা বলছেন—যে ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ গত দেড় দশকে খুব ভালোভাবেই পরিচিত হয়েছে।
তাই প্রশ্নটি এখন আর নিছক ব্যঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
তবে কি শেখ হাসিনার ভূত তারেক রহমানের ওপর আছর করেছে?
ক্ষমতার যে ঔদ্ধত্য, দলীয় সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেওয়া, বাস্তবতা অস্বীকার করা এবং সবকিছু ‘নিয়ন্ত্রণে’ থাকার গল্প বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত যে ভূত শেখ হাসিনারই ঘাড় মটকে দিয়েছিল—
সেই একই ভূত তারেক রহমানের ঘাড়ও মটকে দেবে না তো?
লেখক—
মইনুল হক
মইনুল হক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক্টিভিস্ট ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক।