হোমমন্তব্য প্রতিবেদনবীণা সিক্রি'রা সভ্য হলে কূটনীতি মানবিক হতো

বীণা সিক্রি’রা সভ্য হলে কূটনীতি মানবিক হতো

প্রকাশ

তারিখ

বিভাগ

ভারতীয় কূটনীতির অভিধানে প্রতিবেশীর মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা কিংবা সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক—এই শব্দগুলো যেন বরাবরই অনুপস্থিত। সেখানে কূটনীতি মানে বন্ধুত্ব নয়, প্রভাব বিস্তার; সহযোগিতা নয়, নিয়ন্ত্রণ; পারস্পরিক স্বার্থ নয়, দিল্লির স্বার্থকে প্রতিবেশীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া।

এই আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী মানসিকতার কারণেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সঙ্গে তার প্রতিবেশীদের সম্পর্ক বারবার অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও বিরোধে আক্রান্ত হয়েছে। সভ্য রাষ্ট্রের কূটনীতিতে যেখানে ছোট-বড় নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদাকে সম্মান করার সংস্কৃতি থাকে, ভারতীয় কূটনীতির একটি প্রভাবশালী ধারা সেখানে আজও ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব থেকে বের হতে পারেনি।

আর এই ধারার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি হলেন সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বীণা সিক্রি

১৯৭১ সালে ভারতীয় পররাষ্ট্রসেবায় যোগ দেওয়া এই কূটনীতিকের দীর্ঘ কর্মজীবনকে দিল্লি নিশ্চয়ই নিজের মতো করে মূল্যায়ন করবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নাম উচ্চারিত হলে অনেকের স্মৃতিতে বন্ধুত্বের কূটনীতি নয়, বরং হস্তক্ষেপ, চাপ, পক্ষপাত এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগই সামনে আসে।

বাংলাদেশে বীণা সিক্রির অধ্যায়

বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন বীণা সিক্রি। বাংলাদেশের সেই সময়কার রাজনৈতিক অস্থিরতার নানা ঘটনায় ভারতীয় দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক মহলে বহু প্রশ্ন, অভিযোগ ও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।

আমার মূল্যায়নে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করার দিল্লির যে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প পরবর্তী সময়ে আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিপর্ব ছিল বীণা সিক্রির ঢাকায় দায়িত্ব পালনের সময়টি।

শেখ হাসিনাকে দিল্লির সবচেয়ে বিশ্বস্ত রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের আগ্রহ কখনোই গোপন ছিল না। পরবর্তী দেড় দশকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যেভাবে প্রায় একতরফা নির্ভরতার সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল, সেই ইতিহাসের পেছনের রাজনৈতিক প্রস্তুতি খুঁজতে গেলে বীণা সিক্রির সময়কাল এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

তৎকালীন বাংলাদেশে জেএমবি ও অন্যান্য উগ্রবাদী সংগঠনের উত্থানের নেপথ্যেও বিদেশি সংযোগ নিয়ে বহুদিন ধরে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন রয়েছে। ভারতীয় সংযোগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত বাংলাদেশের জনগণ কখনো পেয়েছে কি না—সেটিই বড় প্রশ্ন।

২১ আগস্ট এবং যে প্রশ্নগুলো এখনো মরে যায়নি

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি।

এই হামলার সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে এবং হামলার পর তার ভারতে অবস্থানের বিষয়টিও বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে বীণা সিক্রির সময়কার ভারতীয় হাইকমিশনের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

আমি এসব সন্দেহকে আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করছি না। কিন্তু প্রশ্ন তোলার অধিকার নিশ্চয়ই আছে—

বাংলাদেশের একটি ভয়াবহ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যাদের নাম ঘুরেফিরে এসেছে, তাদের কেউ যদি পরে ভারতে নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে থাকে, তাহলে সে সম্পর্কের ব্যাখ্যা কী?

সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কি ভারতের দায়িত্ব নয়? নাকি দিল্লির নাম এলেই বাংলাদেশের ইতিহাসের কিছু দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ রাখতে হবে?

ইসলাম নিয়ে বিদ্বেষ, অথচ জামিয়া মিলিয়ায় অধ্যাপনা!

বীণা সিক্রির রাজনৈতিক বক্তব্যে ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রতি তার প্রবল বিরূপতা বহুবার স্পষ্ট হয়েছে। অথচ পরিহাসের বিষয়—তিনি দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও একাডেমিকভাবে যুক্ত ছিলেন।

এই বৈপরীত্য আমার কাছে নিছক ব্যক্তিগত কৌতুক নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্ম, উগ্রবাদ ও ভূরাজনীতিকে কীভাবে রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়, তার প্রতীক।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাসে ভারতীয় ভূখণ্ড, সীমান্ত যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের প্রসঙ্গ বহুবার এসেছে। ফলে জেএমবির ভারত-সংযোগসহ এসব বিষয়ে আরও গভীর ও স্বাধীন অনুসন্ধান প্রয়োজন।

উগ্রবাদকে কে সৃষ্টি করেছে, কে ব্যবহার করেছে, কে আশ্রয় দিয়েছে এবং কে রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছে—এই চারটি প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর পাওয়া গেলে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অন্ধকার ইতিহাসই নতুন করে লিখতে হবে।

‘ডামি নির্বাচন’-এর পক্ষেও দিল্লির পুরোনো সাফাই

২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক নির্মম প্রহসন। বিএনপি ও জামায়াতসহ প্রধান বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনকে জনগণের একটি বড় অংশ ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

কিন্তু বীণা সিক্রির ভাষ্য ছিল ভিন্ন। তার বক্তব্যের সারকথা ছিল—বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচন বর্জন করলেও শেখ হাসিনার সরকারের বৈধতা তাতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।

চমৎকার! ভোটার নেই—সমস্যা নেই। প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই—সমস্যা নেই। বিরোধী দল নেই—সমস্যা নেই। ক্ষমতাসীন দল নিজের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিজেরই ‘ডামি প্রার্থী’ দাঁড় করিয়ে নির্বাচন করছে—তাতেও সমস্যা নেই।

দিল্লি সন্তুষ্ট থাকলেই সেটাই যেন গণতন্ত্র! গণতন্ত্রের এমন অভিনব সংজ্ঞা সম্ভবত ভারতীয় আধিপত্যবাদী কূটনীতির গবেষণাগারেই আবিষ্কার করা সম্ভব।

বাংলাদেশ যখন রক্তাক্ত, তখনও প্রশংসা

২০২৪ সালে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা এবং শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে যখন বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা ফুঁসে উঠেছিল, যখন রাজপথ রক্তাক্ত হচ্ছিল, তখনও ভারতের কূটনৈতিক ও নীতিনির্ধারক মহলের একটি অংশ হাসিনা সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছিল।

বীণা সিক্রির বক্তব্যও সেই রাজনৈতিক মানসিকতার বাইরে ছিল না। বাংলাদেশের মানুষ তখন স্বাধীনতা, ভোটাধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়ছে—আর দিল্লির বহু সাবেক আমলা ব্যস্ত ছিলেন শেখ হাসিনার শাসনের পক্ষে যুক্তি তৈরিতে।

এটাই কি বন্ধুত্ব? এটাই কি কূটনীতি?

না। এটি বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে আধিপত্য।

এখন তারেক রহমানের সরকারই নাকি ‘রূঢ় ও অহংকারী’!

সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দিল্লি সফরের প্রসঙ্গে তারেক রহমানের সরকার যখন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে সামনে এনেছে, তখন বীণা সিক্রি উল্টো বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানকেই ‘রূঢ়’ ও ‘অহংকারী’ বলে সমালোচনা করেছেন।

অর্থাৎ বাংলাদেশের সাবেক একজন শাসক যদি নিজের দেশে গুরুতর অপরাধের অভিযোগের মুখোমুখি হন, তিনি ভারতে আশ্রয় নেবেন—এটা স্বাভাবিক।

কিন্তু বাংলাদেশ যদি বলে, তাকে ফেরত দিন, তিনি বাংলাদেশের আইনের মুখোমুখি হোন—সেটাই নাকি ঔদ্ধত্য!

এ কোন কূটনৈতিক নৈতিকতা?

যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও ব্যাপক রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে, তাকে আশ্রয় দিয়ে রাখা যদি ‘সভ্যতা’ হয়, তবে তাকে আইনের মুখোমুখি করার দাবি কীভাবে ‘রূঢ়তা’ হয়?

বাংলাদেশ কি ভারতের উপনিবেশ? বাংলাদেশের আদালত কি দিল্লির অনুমতি নিয়ে বিচার করবে? বাংলাদেশের জনগণ কাকে বিচারের মুখোমুখি দেখতে চায়, সেটাও কি সাবেক ভারতীয় কূটনীতিকদের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে?

সমস্যাটা এখানেই।

বীণা সিক্রিরা বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সমমর্যাদার প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত নন। তাদের কূটনৈতিক চিন্তার গভীরে এখনো সেই পুরোনো মনিবসুলভ ধারণা—দিল্লি কথা বলবে, ঢাকা শুনবে; দিল্লি সিদ্ধান্ত নেবে, বাংলাদেশ মানবে।

কিন্তু সেই যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক চাইলে বন্ধুত্বের ভাষায় কথা বলতে হবে। সম্মানের ভাষায় কথা বলতে হবে। বাংলাদেশের জনগণকে পাশ কাটিয়ে কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক দলকে দিল্লির স্থায়ী প্রতিনিধি বানিয়ে রাখার যুগ শেষ করতে হবে।

কূটনীতি যদি সত্যিই সভ্যতার শিল্প হয়, তবে সেখানে দম্ভের জায়গা নেই। আধিপত্যের জায়গা নেই। প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাতব্বরির জায়গা নেই। মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো স্বৈরশাসকের পক্ষে সাফাই গাওয়ারও জায়গা নেই।

আর সে কারণেই আবারও বলি—

বীণা সিক্রি’রা সভ্য হলে কূটনীতি মানবিক হতো।


লেখকঃ মইনুল হক
মইনুল হক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক্টিভিস্ট ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক।

সম্পাদকীয় দ্রষ্টব্য: এটি মইনুল হক এর একটি মতামতধর্মী কলাম। নিবন্ধে উল্লিখিত রাজনৈতিক মূল্যায়ন, অভিযোগ, অনুমান ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস মূল লেখকের নিজস্ব; সেগুলো The Veritas-এর সম্পাদকীয় অবস্থান হিসেবে বিবেচ্য নয়

সাম্প্রতিক পোস্ট