হোমবিশ্বমক্কা জোট আসলে কী? যৌথ সেনাবাহিনীও কি গড়ে উঠবে?

মক্কা জোট আসলে কী? যৌথ সেনাবাহিনীও কি গড়ে উঠবে?

প্রকাশ

তারিখ

বিভাগ

পুরোনো বস্তাপচা বুলি বাদ দিন। আমাদের হাত এখন ট্রিগারে পৌঁছে গেছে। আমাদের আর কারও সুরক্ষার প্রয়োজন নেই। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ভূখণ্ডকে আবার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া যাবে না—কখনোই না!

ইব্রাহিম কারাগুল
Yeni Şafak-এর কলামিস্ট

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘মক্কা জোট’ বা ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে সাম্প্রতিক ইতিহাসে মুসলিম বিশ্বের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন তুর্কি কলামিস্ট ইব্রাহিম কারাগুল। তাঁর মতে, আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন ও ইউরোপীয় সামরিক অভিযানের পর আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে এত বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ আর দেখা যায়নি। এমনকি ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর থেকে, আরও বিস্তৃত অর্থে শীতল যুদ্ধের অবসানের পর মুসলিম ভূখণ্ডে যে ধারাবাহিক যুদ্ধ, আগ্রাসন ও সংঘাত শুরু হয়েছিল, তার গতিপথ বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে।

কারাগুলের ভাষায়, উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর এই বিস্তৃত ভূখণ্ড দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশি শক্তির প্রতিযোগিতা, হস্তক্ষেপ ও লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রভাব আরও গভীর হয়েছে; আর ইরানি বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ইসরাইল–ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা মধ্যপ্রাচ্যের বহু অঞ্চলকে একের পর এক সংঘাতের ময়দানে পরিণত করেছে। এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তিনি মক্কা চুক্তিকে এমন একটি ঘটনা হিসেবে দেখছেন, যা প্রথমবারের মতো আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর সামনে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক আশার দুয়ার খুলতে পারে।

তুরস্কের ক্ষেত্রে অবশ্য ইতিহাসের এই উল্টোযাত্রা আরও আগেই শুরু হয়েছিল বলে তাঁর দাবি। সাইপ্রাস শান্তি অভিযান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুদান, কারাবাখ, লিবিয়া, কাতার, সোমালিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে আঙ্কারার সক্রিয় উপস্থিতিকে তিনি তুরস্কের হারানো ভূরাজনৈতিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর মতে, গত এক দশকে এসব পদক্ষেপ শুধু তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিই বদলায়নি, বরং একটি বৃহত্তর ভূখণ্ডে শক্তির হিসাবও নতুন করে লিখতে শুরু করেছে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী জোট গড়ে তোলা সহজ নয়—এ কথাও তিনি স্বীকার করেন। এ অঞ্চলের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক প্রায়ই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নেতৃত্ব ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অতীতে বহু আঞ্চলিক জোট ও প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রভাববলয়ের অংশে পরিণত হয়েছে, এমনকি স্থানীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর পশ্চিমা আধিপত্য ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু কারাগুল মনে করেন, এবারকার পরিস্থিতি মৌলিকভাবে ভিন্ন। শীতল যুদ্ধের সময়কার শক্তির ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে, ইউরোপ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা কাঠামোর দাবি করছে।

তাঁর আপত্তি মূলত সেই রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে, যা এখনো যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপ অক্ষের বাইরে কোনো স্বাধীন আঞ্চলিক উদ্যোগকে বাস্তবসম্মত বলে মানতে চায় না। কারাগুলের মতে, এ ধরনের চিন্তায় ধরে নেওয়া হয়—বিশ্বের ক্ষমতা অন্য কোথাও উৎপন্ন হবে, সম্পদ ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্র অন্যরা নির্ধারণ করবে, আর মুসলিম বিশ্বের কাজ হবে কেবল আনুগত্য করা। তিনি এটিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণের বদলে ‘মানসিক উপনিবেশবাদ’ হিসেবে দেখেন।

উসমানীয়, সেলজুক, উমাইয়া, আব্বাসীয় ও আন্দালুসীয় ঐতিহ্যের কথা টেনে তিনি যুক্তি দেন, যে ভূখণ্ড একসময় সাম্রাজ্য নির্মাণ করেছে, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশ ছিল, তাকে স্থায়ীভাবে প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে কল্পনা করাই ইতিহাসের অপমান। তাঁর বক্তব্য—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ দুর্বল হলেও তারাই চিরকাল এই অঞ্চলের মালিক থাকবে, এমন ধারণার যুগ শেষ হয়ে গেছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ‘মক্কা’ নামের প্রতিরক্ষা উদ্যোগকে তিনি একটি সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাঁর কল্পনায় ভবিষ্যতে এর সঙ্গে মিসর, কাতার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সুদান, সিরিয়া, ইরানি প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত ইরাক, এমনকি আজারবাইজান ও উজবেকিস্তানের মতো তুর্কি প্রজাতন্ত্রও যুক্ত হতে পারে। তবে ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক লক্ষ্য বিবেচনায় তেহরান এমন একটি কাঠামোর অংশ হবে না বলেই তাঁর ধারণা।

কারাগুল এই সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক পরিসরকে একটি ‘সুপার বেল্ট’ হিসেবে কল্পনা করেন—মধ্য এশিয়া থেকে পশ্চিম এশিয়া হয়ে উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক অঞ্চল। তাঁর মতে, এ অঞ্চলের অর্থনীতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, জনশক্তি, সামরিক প্রযুক্তি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা একত্রিত হলে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

এই প্রকল্পে তুরস্ককে তিনি অগ্রবর্তী শক্তি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর আঙ্কারার সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়ন, পিকেকে, ফেতো ও দায়েশের বিরুদ্ধে অভিযান এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকটে সক্রিয় রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকার মধ্যে তিনি একই বৃহত্তর কৌশলের ধারাবাহিকতা দেখতে পান। তাঁর বক্তব্য, তুরস্ক শুধু নিজেকে শক্তিশালী করছে না; একই সঙ্গে প্রতিবেশী ও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রকেও নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তৈরির আহ্বান জানাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েক বছর আগের তুরস্কবিরোধী আঞ্চলিক জোটের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন কারাগুল। তাঁর বর্ণনায়, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্যোগে সৌদি আরব, বাহরাইন, গ্রিস, গ্রিক সাইপ্রিয়ট প্রশাসন এবং মিসরকে নিয়ে তুরস্ককে প্রতিরোধের একটি রাজনৈতিক ও সামরিক বলয় গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। ভূমধ্যসাগরে জ্বালানি, সামরিক মহড়া ও কৌশলগত সহযোগিতায় এর প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল।

কারাগুল আরও অভিযোগ করেন, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সুদান, সোমালিয়া, লিবিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে এবং ১৫ জুলাইয়ের তুর্কি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সঙ্গেও তারা কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিল। এগুলো গুরুতর রাজনৈতিক অভিযোগ এবং তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন হলেও, এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই তিনি বলেন—তুরস্ক তখন দেশের ভেতরে ও বাইরে ওই ফ্রন্টের বিরুদ্ধে প্রায় একাই দাঁড়িয়েছিল।

তাঁর দাবি, সময়ের সঙ্গে সেই তুরস্কবিরোধী সমীকরণ ভেঙে পড়ে। সৌদি আরব বুঝতে পারে ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীতি তাদের নিজেদের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। মিসরও উপলব্ধি করে, লিবিয়া ও সুদানের অস্থিতিশীলতা শেষ পর্যন্ত মিসরকেই ঘিরে ফেলতে পারে। ফলে একে একে রাষ্ট্রগুলো সেই বলয় থেকে দূরে সরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ইসরাইল–সংযুক্ত আরব আমিরাত অক্ষই মূলত টিকে থাকে।

নতুন মক্কা জোটকে ইরান কিংবা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো পশ্চিমা প্রকল্প হিসেবে দেখতেও নারাজ কারাগুল। তাঁর মতে, তুরস্কের জন্য ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কোনো বাস্তবসম্মত কৌশলগত প্রয়োজন নেই; রাশিয়ার বিরুদ্ধেও এই কাঠামো গড়ে উঠছে না। দক্ষিণ এশিয়ার দিক থেকে রাশিয়াকে ঘিরে ধরার মার্কিন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও তিনি এটিকে দেখেন না। তাই যারা এই উদ্যোগকে ‘নতুন পশ্চিমা ফ্রন্ট’ বা ‘বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য প্রকল্পের নতুন সংস্করণ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, তাঁদের বিশ্লেষণকে তিনি পুরোনো মানসিকতার পুনরাবৃত্তি বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

তাঁর বিশ্লেষণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে কাতার সংকটের সময় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ তুরস্ক ঠেকিয়ে দিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমানেও সৌদি আরবকে ঘিরে কোনো আঞ্চলিক পরিকল্পনা বা চাপের আশঙ্কা রিয়াদকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসে থাকতে পারে বলে তাঁর অনুমান। এই সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের পেছনে তিনি ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকেই সন্দেহ করেন। তবে এটিও তাঁর রাজনৈতিক অনুমান, কোনো প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।

কারাগুলের মূল যুক্তি হলো—শুধু শত শত কোটি ডলারের পশ্চিমা অস্ত্র কিনে একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দেওয়া কিংবা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। একবিংশ শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে টিকে থাকতে হলে নিজস্ব সামরিক শক্তি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং যৌথ অস্ত্র প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে।

এই জায়গায় তিনি তুরস্কের প্রস্তাবকে খুব সরলভাবে উপস্থাপন করেন—একসঙ্গে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা, অস্ত্র প্রযুক্তি উন্নত করা, সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা একত্র করা এবং বাইরের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরতা কমানো। তাঁর মতে, ‘মার্কিন সুরক্ষা’ কিংবা ‘ইসরাইলের সঙ্গে শান্তি’কে স্থায়ী নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচনা করা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়।

সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের অভিজ্ঞতাকে সামনে এনে তিনি বলেন, গত পঞ্চাশ বছরের নিরাপত্তা ধারণা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। যেসব রাষ্ট্র দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা করেছে এবং বিনিময়ে সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করেছে, তারা সংকটের মুহূর্তে সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দেখেছে। তাঁর মূল্যায়নে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি শুধু ইরানকে ঘিরে নয়; ইসরাইলের সামরিক ও কৌশলগত সম্প্রসারণ নিয়েও আরব রাষ্ট্রগুলোর নতুনভাবে ভাবতে হবে। তুরস্ককেও তিনি এই সম্ভাব্য ঝুঁকির বাইরে মনে করেন না।

এ কারণেই মক্কা প্রতিরক্ষা উদ্যোগকে নিয়ন্ত্রিত কিন্তু দ্রুতগতিতে সম্প্রসারণের পক্ষে মত দেন কারাগুল। তাঁর ভাষায়, পৃথিবীর ওপর একটি বড় ভূরাজনৈতিক ঝড় নেমে আসছে এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোকে সেই সম্ভাব্য অস্থিরতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। কোনো দেশেরই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া কিংবা চীনের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা উচিত নয়; বরং স্বতন্ত্র আঞ্চলিক সক্ষমতা গড়ে তোলাই হবে কার্যকর পথ।

এই সমীকরণে পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি, তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও সামরিক প্রযুক্তি এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে তিনি তিনটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখেন। এর সঙ্গে মিসর, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া এবং আফ্রিকার বড় রাষ্ট্রগুলোর জনশক্তি, সম্পদ ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান যুক্ত হলে একটি সম্পূর্ণ নতুন শক্তিবলয় তৈরি হতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস।

কারাগুলের ভাষায়, এই ধরনের উদ্যোগকে যারা হালকা করে দেখছে, ব্যঙ্গ করছে বা শুরুতেই অকার্যকর প্রমাণের চেষ্টা করছে, তাদের অবস্থানও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর সন্দেহ—এই প্রতিরোধের পেছনে এমন রাজনৈতিক স্বার্থ থাকতে পারে, যারা এই অঞ্চলকে স্বাধীন শক্তিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে দেখতে চায় না।

লেখাটির সবচেয়ে তীব্র বক্তব্য আসে নিরাপত্তা নির্ভরতার প্রশ্নে। কারাগুল বলেন, এই ভূখণ্ড আর যুদ্ধ চায় না, যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে চায় না, নিজেদের সম্পদ লুট হতে দিতে চায় না এবং অন্য কোনো শক্তির কাছ থেকে ‘সুরক্ষা’ কিনতেও চায় না। তাঁর ভাষায়, “আমাদের নিজস্ব অস্ত্র আছে, নিজস্ব বুদ্ধি আছে, নিজস্ব ঐতিহাসিক শক্তির ঐতিহ্য আছে। আমাদের হাত ট্রিগারের দিকে বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এগুলোই যথেষ্ট। আর আমাদের হাত ইতোমধ্যে ট্রিগারে পৌঁছে গেছে।”

তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘদিনের ইসরাইল–ইরান সংঘাত অক্ষ থেকেও বের করে আনতে হবে। তিনি মনে করেন, ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার আঞ্চলিক শক্তির উল্লেখযোগ্য অংশ হারিয়েছে এবং ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাতের ফ্রন্ট যাতে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।

একই সঙ্গে তিনি ইসরাইলের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি পরিচালনার ধারণারও কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, যতদিন এ অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্র বাইরের শক্তির নিরাপত্তা প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো হবে, ততদিন প্রকৃত শান্তির কাঠামো তৈরি হবে না। আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে একসময় ‘ইরানের ভয়’ বিক্রি করা হয়েছে, এখন ‘তুরস্কের ভয়’ বিক্রি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও তাঁর।

কারাগুল প্রশ্ন তোলেন, গত তিন দশকের অধিকাংশ বড় যুদ্ধ কেন আরব ভূখণ্ডেই সংঘটিত হয়েছে? তাঁর মতে, এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই আরব বিশ্বের বহু রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা উপলব্ধি করতে পারবে। তিনি তুরস্ককে এ অঞ্চলের জন্য একটি ‘অগ্রদূত শক্তি’ এবং নতুন ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় অংশীদারিত্বের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেন।

তাঁর বিশ্লেষণে মক্কা জোট কোনো একটি রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে গঠিত সামরিক জোট নয়। ইসরাইলের সঙ্গে এর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিলেও বলেন, জোটটির লক্ষ্য ইসরাইলের চেয়েও অনেক বড়—গত একশ বছরে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক বিভাজন, ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ, সম্পদ লুণ্ঠন ও বাইরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার যে ইতিহাস তৈরি হয়েছে, সেটির অবসান ঘটানো।

কারাগুলের চোখে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের তুরস্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা কেবল একটি রাষ্ট্রের রূপান্তর নয়; এটি বৃহত্তর মুসলিম ভূখণ্ডের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসেরও অংশ। তাঁর ভাষায়, এরদোয়ান একশ বছরের ‘বিপর্যয়ের বন্ধনী’ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন এবং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মুসলিম বিশ্বের সামনে নতুন পথ তুলে ধরছেন।

এই বৃহত্তর ভূখণ্ডের সম্পদ, জনশক্তি, পুঁজি, ইতিহাস ও ভূগোল—সবকিছুই আছে বলে মনে করেন তিনি। যা প্রয়োজন তা হলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি। সেই কারণেই চলমান প্রক্রিয়াকে তিনি এক ধরনের ‘আঞ্চলিক মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আর এখানেই তাঁর প্রস্তাব সবচেয়ে স্পষ্ট—মক্কা জোটকে শেষ পর্যন্ত শুধু রাজনৈতিক বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়; ভবিষ্যতে একটি যৌথ সেনাবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তারও আগে তৈরি করতে হবে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ছাতা। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যৌথ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটাতে হবে।

কারাগুলের শেষ বক্তব্য তাই একই সঙ্গে রাজনৈতিক আহ্বান ও সতর্কবার্তা—বিশ্বের যে ভূখণ্ড ইতিহাসের বহু পর্যায়ে ক্ষমতা, বাণিজ্য ও সভ্যতার কেন্দ্র ছিল, তাকে আর বাইরের শক্তির প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে থাকতে দেওয়া যাবে না। অন্যের নিরাপত্তা ছাতার নিচে নয়, নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়িয়েই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।

তাঁর ভাষায়—“বিশ্বের কেন্দ্রীয় এই ভূখণ্ডকে আর কখনো অন্যদের প্রান্তিক অঞ্চলে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। কখনোই না।”


মূল লেখক: ইব্রাহিম কারাগুল
মূল প্রকাশনা: Yeni Şafak
বাংলা ভাষান্তর ও সম্পাদনা: The Veritas

সম্পাদকীয় দ্রষ্টব্য: এটি ইব্রাহিম কারাগুলের একটি মতামতধর্মী কলামের বাংলা ভাষান্তর ও সম্পাদকীয়ভাবে পুনর্বিন্যস্ত সংস্করণ। নিবন্ধে উল্লিখিত রাজনৈতিক মূল্যায়ন, অভিযোগ, অনুমান ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস মূল লেখকের নিজস্ব; সেগুলো The Veritas-এর সম্পাদকীয় অবস্থান হিসেবে বিবেচ্য নয়

সাম্প্রতিক পোস্ট