পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনার ব্যর্থতার পর Donald Trump প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপের সম্ভাবনা নতুন করে সামনে আনা হচ্ছে। ওয়াশিংটন এমন এক কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভেনেজুয়েলার উপকূলে পূর্বে প্রয়োগ করা হয়েছিল—ট্যাংকার আটক, জাহাজ তল্লাশি এবং সামুদ্রিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু হরমুজ প্রণালি কোনো ক্যারিবীয় সাগর নয়; এটি ভূ-রাজনীতির এক বিস্ফোরক সংকীর্ণ করিডোর, যেখানে সামরিক শক্তির প্রদর্শন সহজ হলেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা মোটেও সহজ নয়।
ইরান ও আরব উপদ্বীপের মধ্যবর্তী এই জলপথ বহুদিন ধরেই ইরানের জন্য একটি কৌশলগত দুর্গে পরিণত হয়েছে। কয়েক ডজন কিলোমিটার প্রস্থের এই প্রণালিতে ইরানের উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কার্যত পুরো জলপথকে কভার করে। লারাক, কেশম ও আবু মুসা দ্বীপগুলোকে শুধু দ্বীপ নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ সামরিক আউটপোস্টে রূপান্তর করা হয়েছে—ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার, অস্ত্রভাণ্ডার এবং লঞ্চিং প্যাডসহ। এই বাস্তবতায় কোনো প্রচলিত নৌ অবরোধ কেবল সামরিক অভিযান নয়, বরং আত্মঘাতী ঝুঁকির শামিল হতে পারে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় দৈনিক Rossiyskaya Gazeta–এর সঙ্গে আলাপচারিতায় অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা Vasily Dandykin স্পষ্ট করে বলেন—হরমুজে যুদ্ধ কেবল প্রযুক্তির নয়, বরং ভূগোলের বিরুদ্ধে লড়াই। সংকীর্ণ জলপথে চলাচলরত জাহাজগুলো কার্যত ইরানের উপকূলীয় ফায়ার কন্ট্রোলের আওতায় থাকে। আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেও এই ভৌত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন জাহাজগুলো একদিকে মাইনফিল্ড, অন্যদিকে পাথুরে উপকূলের মাঝে আটকে পড়ে—তখন ক্ষেপণাস্ত্র এড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
ড্যান্ডিকিনের মতে, হরমুজের সবচেয়ে বড় হুমকি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং অদৃশ্য নৌমাইন। ইরানের হাতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক মাইন—সহজ সংস্পর্শভিত্তিক থেকে শুরু করে উন্নত বটম মাইন পর্যন্ত—যেগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ইরান নিজেরাই জানে কোন পথ নিরাপদ, কিন্তু বিদেশি জাহাজের জন্য পুরো প্রণালিই হয়ে উঠতে পারে এক অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এই অঞ্চলে মাইন পরিষ্কার করতে চার মাস সময় এবং প্রায় ৪০টি জাহাজ লেগেছিল—আজকের প্রেক্ষাপটে যেখানে মার্কিন মাইনসুইপার কম এবং ইউরোপীয় মিত্রদের আগ্রহও সীমিত, সেখানে এই কাজ আরও দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের A2/AD কৌশল—যেখানে ব্যালিস্টিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র, সাবসোনিক ক্রুজ মিসাইল, লইটারিং মিউনিশন, স্পিডবোট ও আন্ডারওয়াটার ড্রোন অন্তর্ভুক্ত—হরমুজকে কার্যত একটি মাল্টি-লেয়ারড ডিফেন্স জোনে পরিণত করেছে। এসব অস্ত্রের বড় অংশই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে সংরক্ষিত, যা পূর্ববর্তী হামলার পরও টিকে আছে। ফলে বাহ্যিকভাবে যতটা দুর্বল দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামো তার চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল।
মার্কিন নৌ সক্ষমতার প্রশ্নও এখানে বড় হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলে ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের উপস্থিতি সীমিত, এবং বিদ্যমান যুদ্ধজাহাজগুলোর ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার আংশিক ব্যবহৃত হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্যারিয়ারগুলোকে ইরানের উপকূল থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে, যার ফলে তাদের ফাইটার জেটের কার্যকর পরিসীমা কমে যাচ্ছে। এতে আকাশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে—যা ছাড়া কোনো বড় সামরিক অভিযান কার্যত অসম্ভব।
এদিকে Flightradar24–এর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন C-17 পরিবহন বিমানের সক্রিয়তা বেড়েছে—যা কেবল নৌ অবরোধ নয়, সম্ভাব্য স্থল অভিযানেরও ইঙ্গিত দেয়। তবে ইরানের মতো বিশাল ভূখণ্ডে পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান চালানো যে কতটা বিপজ্জনক, তা ইতিহাসই বারবার প্রমাণ করেছে। কয়েক লাখ সৈন্য ছাড়া এমন অভিযান সফল হওয়া কঠিন—আর সেটি রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের কৌশল স্পষ্ট—সময়ক্ষেপণ ও ক্ষয়যুদ্ধ। তারা সরাসরি বড় সংঘর্ষ এড়িয়ে ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে চায়। প্রণালিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করলেও নিয়ন্ত্রিতভাবে ট্যাংকার চলাচল অব্যাহত রাখা—এই দ্বৈত কৌশলই তার প্রমাণ। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ তৈরি হয়, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দায়ও সরাসরি নিতে হয় না।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি এখন আর কেবল একটি বাণিজ্যিক জলপথ নয়—এটি এক বহুমাত্রিক সামরিক দাবার ছক, যেখানে প্রতিটি চালের মূল্য অত্যন্ত বেশি। যুক্তরাষ্ট্র যদি এখানে অবরোধ আরোপে এগোয়, তবে সেটি ভেনেজুয়েলার পুনরাবৃত্তি হবে না; বরং একটি সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়ানো।
প্রশ্ন এখন একটাই—এই কৌশল কি বাস্তবিক কোনো সামরিক লক্ষ্য অর্জন করবে, নাকি কেবল একটি রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন হয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই “মুখরক্ষা”র পথ খুঁজতে বাধ্য করবে? ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও মাইনে ভরা সংকীর্ণ জলপথে প্রবেশ করা যত সহজ, সেখান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসা ততটাই কঠিন।
তথ্যসূত্রঃ Rossiyskaya Gazeta.

