ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং নতুন বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ – প্রথম পর্ব

ইন্টারসেপ্টভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং নতুন বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ – প্রথম পর্ব

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যার মূল কারণ যে ভারত, এ কথা যারা বুঝতে অক্ষম আমার আজকের আলোচনা আসলে তাদের জন্যে জন্যে নয়। বিএনপি’র আন্দোলন নিয়ে অনেকে টিপ্পনী কাটতো, “ঈদের পরে আন্দোলন হবে”। তারা একথা কিছুতেই বুঝতে চাইতো না যে, আন্দোলনটি শুধুমাত্র শেখ হাসিনা এবং আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে ছিলো না। হাসিনা ভারতের পাপেট সরকার ছিলো সে কথা রাজনীতি সচেতন প্রায় সকলেই জানতো। কিন্তু তার হাকীকত হয়তো অনেকে অনুধাবন করতে পারেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় সুজাতা সিং এর দৌড়-ঝাঁপ এবং ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপ অনেকের ঘুম ভাঙ্গাতে পারেনি। খালেদা জিয়া যখন অনড় অবস্থানে ছিলেন হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়, তখন বিএনপি’তেও অনেকের ভিন্নমত ছিলো অনেকে হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যাবার পক্ষে ছিলেন। জনগণ একতরফা নির্বাচন কে বর্জন করেছিলো।

২০০৮ এর নির্বাচনের অন্তরালে কি ঘটেছিলো সেটা বেগম জিয়া জানতেন। নির্বাচনের ফলাফল যে আগেই নির্ধারিত ছিলো এবং ২০১৪ সালে একই ঘটনার পুনঃরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে সেটা জানার পরে পাতানো নির্বাচনে যাবার আসলে কোনো অর্থ হয় না। প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে ২০১৮ সালে কেন গেলো নির্বাচনে। হ্যাঁ, যাবার দরকার ছিলো না। কিন্তু গোল্ডফিস মেমোরির লোকদের কে জানানোর দরকার ছিলো, প্রমাণ করার দরকার ছিলো হাসিনা কি জিনিস। বামদিকে ঝুঁকে থাকা বিএনপি’র কিছু শীর্ষ নেতাদেরকেও বুঝতে দেবার দরকার ছিলো। এখানে বিস্তর তর্ক, যুক্তি এবং আলোচনা আছে – আমার আলোচনার আসল উদ্দেশ্য আসলে ঐসব কুযুক্তি খন্ডনের পিছনে বেহুদা সময় ক্ষেপণ করা নয়।

২০২৪ এর ডামি নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ জেনে গিয়েছিলো দিল্লীর পাপেট প্রতারক হাসিনার কাছে নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা হলো নির্বোধের কাজ। সীমাহীন দুর্নীতি এবং ঋণের দায়ে যখন দেশ ডুবতে বসেছে তখন তীরের সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলো দেশের দুইটি প্রজন্ম যারা কখনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার নির্বাচনের সুযোগ পায়নি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে পরোক্ষভাবে জনগণ শাসন কার্য পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে থাকে। জনপ্রতিনিধিরা জন-আকাঙ্খার বাস্তবায়নের জন্যে কাজ করে, জনগণের কাছে একটা জবাবদিহিতার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে কেননা পাঁচ বছর পরে আবার ভোটের জন্যে জনগণের দরজায় যেতে হবে।

ফ্যাসিস্ট হাসিনা “জন-আকাঙ্খা”র ধারণাটিকেই বিলুপ্ত করে দিয়েছিলো। গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এই ধারণাগুলোকে পদদলিত করে ব্যক্তিপূজাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। সবখানেই ছিলো তার দাম্ভিক আমিত্ব এবং তার পিতৃপূজা। আমি চালাই, আমি খাওয়াই, বেশি বাড়াবাড়ি করলে সবকিছু বন্ধ করে দেবো, দেশটা আমার, আমার বাবা দেশটি স্বাধীন করেছে – ইত্যাদি ছিলো তার নিত্য দিনের ব্যবহার্য্য শব্দমালা।

দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গেছে তখন নতুন দুইটি প্রজন্ম বুঝতে পারলো, দেশের মালিকানা তাদের হাতে না থাকা হলো সমস্যার মূল কারণ। ফ্যাসিস্ট ছাত্রদের সাথে যখন মধ্যযুগের সামান্ত প্রভূর মতো আচরণ করা শুরু করলো তখন স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েরা আওয়াজ তুললো, “কথা কথায় বাংলা ছাড়, বাংলা কি তোর বাপ-দাদার?”

তাই তো, বুলেটের সামনে বীরশ্রেষ্ট আবু সাইদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়াটা লখ্য-কোটি প্রাণে প্রেরণা ও শক্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো নিমিষেই। আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম গণহত্যা চালিয়েও পাড় পায়নি ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা। তাকে পালিয়ে যেতে হয়েছে।

বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো কোনো সরকারপ্রধানকে  তার মন্ত্রী পরিষদ এবং সকল সাংসদসহ পালিয়ে যেতে হয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণ আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রাণ পেয়েছে ছাত্র-জনতার বিপ্লব। দেখা পেয়েছে বিজয়ের মাহেন্দ্র-ক্ষণের। বাংলাদেশের জন্যে এটা ছিলো দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ এবং ৫ই আগস্ট হলো দ্বিতীয় বিজয় দিবস।

ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী হাসিনা তার প্রভু ভারতে পালিয়ে গিয়ে প্রমাণ করেছে – বাংলাদেশের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের বিজয় হলো ভারতীয় আধিপত্যবাদ তথা ভারতের বিরুদ্ধে। তাই তো প্রথম থেকেই নতুন বিপ্লবী সরকারের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা শুরু করে দিলো ভারত। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগদান করার মতো নূন্যতম কূটনৈতিক শিষ্টাচারটুকুও দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে পরাজিত ভারত সরকার।

কোনো পূর্ব সতর্কতা জানানো ব্যতীরেকেই শেখ হাসিনার প্রভু ভারত রাতের আঁধারে ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধের সবকটি গেইট খুলে দিয়ে আকস্মিক বন্যা প্লাবিত করেছে ফেনী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ব্রাক্ষ্মণাবাড়িয়া জেলাসহ বাংলাদেশের বিরাট অঞ্চল। আগ্রাসী ভারতের প্রকৃত কুৎসিত চেহারা গোটা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে শরীক প্রতিটি বাংলাদেশের নাগরিক বুঝতে পেরেছেন দিল্লীর সেবাদাসী হাসিনাকে উৎখাত করার কারণেই ভারত প্রতিশোধ নিয়েছে।

বিশ্ব কূটনীতিতে অচল মাল ভারত তার বাংলাদেশ নীতিতে নিদারুণ দৈন্যতার পরিচয় দিয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা ও কৌশলগত নিরাপত্তার জন্যে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের জন্যে ভারতকে যতটা না প্রয়োজন, ভারতের জন্যে বাংলাদেশের প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী। এই স্পর্শ কাতর জায়গাটি ভারতে খুব আনাড়ীভাবে হ্যান্ডল করেছে।

ভারত এমন কোনো বৈশ্বয়িক কিংবা আঞ্চলিক পরাশক্তি নয় যে সে তার চারপাশ অন্যান্য পরাশক্তির মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সত্যি বলতে কি, বিগত বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে একক পরাশক্তি খোদ যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে কৌশলগত ভূরাজনৈতিক স্বার্থগুলো সংরক্ষণ করে আসছিলো সেই অবস্থান তারা ২০২০ সালের দিকেই হারানো শুরু করেছে। রাশিয়া এবং চীনের কথা তো বলায় বাহুল্য। সেখানে ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশের পক্ষে অন্য দেশে জোর করে তাবেদার সরকার টিকিয়ে রাখার নীতি যে ব্যাকফায়ার করবে তা তো সহজেই অনুমেয়।

ভারতের কংগ্রেস সরকার এবং তাদের ব্যর্থ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ঠিক সেই কাজটিই করার প্রয়াস চালিয়ে ছিলো বাংলাদেশে। বাংলাদেশের দ্বি-দলীয় দুটি পরিবার কেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতিতে বিএনপি’র পালা শেষে আওয়ামীগ আসবে এবং আওয়ামীলীগের পালা শেষে বিএনপি আসবে সেটা একটি অলিখিত নিয়মেই পরিণত হয়েছিলো। ১৯৯০ এ স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতায় অভ্যস্ত হতে চলেছিলো বাংলাদেশ।

কিন্তু ভারতের সমস্যা হলো বিএনপি এবং জামায়াত জোট যখন বিরোধী দলে যায় তখনো তারা খুব শক্তিশালী থাকে। হাসিনা ক্ষমতায় থাকলেও ভারতের স্বার্থে প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) খুব বেশি ভূমিকা নিতে পারেনি। হাসিনাকে ইসলামী লেবাস নিয়েই ক্ষমতায় আসতে হয়েছিলো – মাথায় পট্টি এবং হাতে তাসবীহ নিয়ে শপথ পাঠ করেছিলো পাবলিক সেন্টিমেন্টের সাথে এডজাস্ট করার জন্যে। সে অবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুত্ববাদীদের শাসন প্রতিষ্ঠা ছিলো খুবই কঠিন ব্যাপার।

তাই ২০০২ সালে যখন বিএনপি-জামায়াত জোট আবার ক্ষমতায় আসে আরো শক্তিশালী হয়ে তখন থেকেই ‘র’ তার মিশনে নেমে পড়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলার জন্যে। ২০০৪-২০০৬ এর দিকে বিএনপি’র কিছু কৌশল গত ভুল ভারত এবং ‘র’ এর কাজ কে অতিরিক্ত সুবিধা এনে দিয়ে ছিলো। আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে বলে সেদিকে এখন যাচ্ছি না।

বিএনপি এবং জামায়াত জোট ভারতীয় কৌশল বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় ছিলো। তাই রাজনৈতিক ভাবে এই জোট কে বিপর্যন্ত করে ফেলাই ছিলো ভারতীয় কৌশল। যুদ্ধপরাধ ইস্যু নিয়ে প্রথমে জামায়াত কে টার্গেট করে। গা বাঁচাতে বিএনপি জামায়াত থেকে দূরত্ব বজায়া রাখার কৌশল অবলম্বন করে। এ কাজে বিএনপি’র বাম ঘেঁষা লোকগুলো মূখ্য ভূমিকা পালন করে।

জামায়াত কে পর্যুদস্ত করে যখন বিএনপি’র দিকে হামলে পরে দিল্লী এবং আর দেশী এজেন্ট আওয়ামীলীগ ততক্ষণে বিএনপি’র অবস্থা অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়ে। দলের বাম ঘেঁষা ভারতপন্থীরা দফায় দফায় বিশ্বাসঘাতকতা করে খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাকফুটে ফেলে দেয়। বাড়ী থেকে উচ্ছেদ এবং খালেদা জিয়ার জেল হলো এই সব ঘটনার ধারাবাহিকতায় মাত্র। দলের ভিতরে ভারতীয় এজেন্টদের দৌরাত্ব এতোটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে, যখন খালেদা জিয়া কে জেলে পাঠানো হলো তখনো বিএনপি’র ভারতপন্থীরা ভারতের বিজেপি’র প্রধান অমিতশাহ’র সাথে কথা হয়েছে, অমিত শাহ খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোর নিন্দা জানিয়েছেন এইসব বলা শুরু করলো। পরে অমিত শাহ নিজেই বিবৃতি দিয়ে বললো যে, বিএনপি’র কারো সাথেই আমিত শাহ’র এরকম কোনো কথাই হয়নি। ভারতীয় কূটকৌশলের কাছে মার খেয়ে খালেদা জিয়ার জেলে বন্দি হবার চেয়ে নিজের মান বাঁচানোই দল হিসেবে বিএনপি’র জন্যে দায় হয়ে পড়লো।

শুরু হলো একচ্ছত্র ভারতীয় আধিপত্য। পাপেট হাসিনার দাম্ভিকতা এবং বাংলাদেশের প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী এমনকি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও ভারতীয়দের অবাধ বিচরণ। সচিবায়ল কে পুরোপুরি ভারতীয় নিয়ন্ত্রণে নেয়া হলো লোভী কিছু সচিবদেরকে পদায়ন এবং ব্যাপকভাবে হিন্দুত্ববাদীদের কে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোর মাধ্যমে। পুলিশে হিন্দু ও সংখ্যালঘু উপজাতীয়দের ব্যাপক নিয়োগের মাধ্যমে পুরোপুরি ভারতের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছিলো বাহিনীটিকে। সেনাবাহিনীতে পদায়ন ও দায়িত্ব বন্টনে ছিলো দিল্লীর সাউস ব্লকের নিরঙ্কুশ আধিপত্য। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তরে ভারতীয় ‘র’ এর অফিস! এগুলো ছাড়াও সারা দেশে প্রশাসন এবং বিভিন্ন জায়গায় ছিলো ‘র’ এর ছয় লাখ এজেন্ট। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে পুরোপুরি কুক্ষিতগত করে ফেলেছিলো ভারত তার এদেশীয় এজেন্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা এবং আওয়ামীলীগের ছত্রচ্ছায়ায়।

কিন্তু একটি দেশকে যে একাবিংশ শতাব্দীতে এভাবে করতলগত করা যায় না, কিংবা সাময়িকভাবে গেলেও সময় পরিক্রমায় গণেশ উল্টে যেতে পারে তা অনুধাবন করতে পারেনি গো-মূত্র সেবনকারী ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং আমলারা।

মইনুল হক

ডেট্রয়েট, মিশিগান।

আরো সংবাদ ও বিশ্লেষণ

অন্যান্য ট্যাগ সমূহঃ

জনপ্রিয় আর্টিক্যাল