যুদ্ধ কখনোই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয় এক জায়গায়, কিন্তু তার অভিঘাত গিয়ে আঘাত করে সম্পূর্ণ অন্য কোথাও। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় কেটে গেছে। লড়াই চলছে মধ্যপ্রাচ্যে, কিন্তু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শহরগুলোতে—যেখানে নিকটতম ফ্রন্টলাইন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে—সাধারণ মানুষ জেগে উঠছে এক ভিন্ন, নীরব অথচ ধীরে ধীরে বিস্তৃত সংকটের মুখে।
জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে, দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকারগুলো জরুরি নির্দেশনা জারি করতে বাধ্য হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ এশিয়ায় পৌঁছেছে, বিস্ফোরণের শব্দ নিয়ে নয়—বরং খালি পাম্প, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, আর বাড়তে থাকা বিলের চাপ নিয়ে।
জ্বালানির স্রোতপথে ধাক্কা
হরমুজ প্রণালী—বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের এক সংকীর্ণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডর—এর সর্বনিম্ন প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। অথচ প্রতিদিন এই পথ দিয়ে পাড়ি দেয় প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া মিলিয়ে এই প্রণালী দিয়ে যাওয়া তেলের ৭৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৫৯ শতাংশের উপর নির্ভরশীল।
যখন এই প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তখন তার অভিঘাত এশিয়ার জ্বালানি বাজারে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই আঘাত হানে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০ থেকে ১৩ শতাংশ লাফিয়ে বেড়ে মার্চের শুরুতেই ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ৮২ ডলারে পৌঁছে যায়, এবং কয়েক দিনের মধ্যেই সাময়িকভাবে ১০০ ডলারও অতিক্রম করে।
এরপর ইরানি ড্রোন হামলায় কাতারের গ্যাস স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে, কাতারএনার্জি উৎপাদন পুরোপুরি স্থগিত করতে বাধ্য হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, এবং সেই ঢেউ দ্রুত এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এই সংখ্যাগুলোর বাস্তব অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পষ্ট করে বলেছে—তেলের দাম যদি ১০ শতাংশ বাড়ে এবং তা এক বছর ধরে স্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে, আর বিশ্ব অর্থনৈতিক উৎপাদন কমে যেতে পারে ০.২ শতাংশ পর্যন্ত।
এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালীর বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি কার্যত একটি কার্যকর অর্থনীতি আর সংকটাপন্ন অর্থনীতির মধ্যকার পার্থক্য। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ফিলিপাইন—এই দেশগুলোর সামনে বিকল্প জ্বালানি উৎস নেই বললেই চলে।
পাকিস্তান: পুনরুদ্ধারের পথ হুমকির মুখে
পাকিস্তান তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই আসে কাতারের এলএনজি থেকে—যে সরবরাহ এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিবারের ওপর চাপ কমাতে সুদের হার কমানোর পরিবর্তে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখন উল্টো সুদের হার বাড়াতে হতে পারে, কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
এই অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত ঐতিহাসিকভাবেই অস্থির এবং ছিদ্রযুক্ত। এখন সেটি আরও অস্থিতিশীল অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে এই সংঘাত বেলুচিস্তান প্রদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার বিরোধিতা করেছে এবং সতর্ক করেছে যে এই সংঘাত তাদের নিজস্ব সীমান্ত উত্তেজনার সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে—ইরান ও ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে।
যে দেশটি একদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছিল এবং অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা সামলাচ্ছিল, সে দেশ এখন এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি।
বাংলাদেশ: জ্বালানি রেশনিংয়ের বাস্তবতা
বাংলাদেশের নিজস্ব তেল উৎপাদন কার্যত নেই বললেই চলে। দেশটি তার প্রায় পুরো জ্বালানি চাহিদাই আমদানির ওপর নির্ভর করে এবং এই সংকটের আগে তার কৌশলগত মজুদও ছিল সীমিত।
যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা দেয়। মার্চের ৫ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জ্বালানি বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয়—বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো—মজুতদারি ঠেকাতে। রাজধানীর দৈনন্দিন চলাচল দৃশ্যমানভাবে ব্যাহত হয়; বাসগুলো রুট কমিয়ে দেয়, আর যেসব ব্যবসা জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল, তারা কার্যক্রম সীমিত করতে শুরু করে।
বাংলাদেশ বহু বছর ধরে বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে—প্রধানত তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি এবং ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে। কিন্তু এই অগ্রগতির ভিত্তি ছিল সবসময়ই সাশ্রয়ী আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ এমন এক সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত এবং কার্যকর বিকল্পও হাতে খুব কম।
অঞ্চলের প্রতিক্রিয়া: চাহিদা নিয়ন্ত্রণের লড়াই
পুরো অঞ্চলে সরকারগুলো যে দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা পরিস্থিতির তীব্রতাকেই প্রতিফলিত করে।
ফিলিপাইনে কিছু সরকারি সংস্থা সাময়িকভাবে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। থাইল্যান্ডে সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত করা হয়েছে এবং মানুষকে লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহারের আহ্বান জানানো হচ্ছে। ভিয়েতনাম দূরবর্তী কাজ (রিমোট ওয়ার্ক) উৎসাহিত করছে এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে। ভারতে রেস্তোরাঁ মালিকরা ইতোমধ্যে সতর্ক করছেন যে, সরকার গৃহস্থালির জন্য রান্নার গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিলে বাণিজ্যিক খাতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা থাইল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপাইনকে এই তেলমূল্য ধাক্কায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান—যারা যথাক্রমে বিশ্বের তৃতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারক—তারা এখন এমন দামে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে, যা এক মাস আগেও কল্পনার বাইরে ছিল।
এই দেশগুলোর পুরো শিল্প কাঠামোই গড়ে উঠেছিল নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর। এখন সেই কাঠামোই চাপের মুখে।
কোনো দেশই নিজের তেল নিজে উৎপাদন করতে পারছে না। কাতারের এলএনজি স্বল্প সময়ে অন্য কোথাও থেকে প্রতিস্থাপন করারও সুযোগ নেই। দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা সরবরাহ শৃঙ্খলকে রাতারাতি নতুন পথে ঘোরানো সম্ভব নয়। ফলে তারা যা করতে পারছে—এবং করছে—তা হলো চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহে রেশনিং, আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন এবং সময়ের অপেক্ষা।
এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবিক কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত।
যুদ্ধের বিস্তার: সীমান্তের বাইরে এক বাস্তবতা
তবে একটি বিষয় এখন আর অনিশ্চিত নয়। এই সংঘাতের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তার প্রভাবের বিস্তৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধ কোনো সীমাবদ্ধ আঞ্চলিক ঘটনা নয়; এর অর্থনৈতিক অভিঘাত ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে—অসমভাবে, কিন্তু গভীরভাবে।
আর যে দেশগুলো এই চাপের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে, তাদের বেশিরভাগই সেই দেশ, যাদের এই বোঝা বহনের সক্ষমতা সবচেয়ে কম।
— শাহমীর গিয়াসউদ্দিন খান
সংবাদ সম্পাদক, A News (ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক)
লেখক পরিচিতি
শাহমীর গিয়াসউদ্দিন খান একজন সংবাদ সম্পাদক, যিনি মূলত ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে কাজ করেন।
দায়িত্ব অস্বীকার (Disclaimer)
এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব। এগুলো The Veritas এর সম্পাদকীয় অবস্থান, মূল্যবোধ বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে না। উন্মুক্ত ও তথ্যসমৃদ্ধ জনআলোচনার প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে পত্রিকাটি বিভিন্ন মতামত প্রকাশের সুযোগ প্রদান করে।

